সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বক্তিয়ার খলজি কিভাবে জয় করেছিল বাংলা?

ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি যিনি বখতিয়ার খলজি নামেও পরিচিত, ছিলেন ঘুরির একজন তুর্কি-আফগান সেনাপতি ও প্রাথমিক দিল্লি সালতানাত সৈনিক জেনারেল এবং প্রথম মুসলিম যিনি বাংলা ও বিহার জয় করেছিল।পূর্ব ভারতে তার প্রতিষ্ঠার সময় আলিমদের ইসলামী দাওয়াতের কাজ সর্বাধিক সাফল্য অর্জন হয়েছিলো এবং ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে পূর্ব ভারতে সবচেয়ে বেশি মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। তিনি ভারত থেকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রবলভাবে দুর্বল করে তুলেছিলেন। তিনি প্রথম দিকে সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেকের মন্ত্রী ছিলেন।

তেরো শতকের শুরুতে তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ-বিন-বখতিয়ার খলজি বাংলার উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাংশে সেন শাসনের অবসান ঘটিয়ে মুসলমান শাসনের সূচনা করেন। ইতিহাসে তিনি বখতিয়ার খলজি নামেই বেশি পরিচিত। তাঁর বংশ পরিচয় সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না। তিনি ছিলেন জাতিতে তুর্কি, বংশে খলজি এবং বৃত্তিতে সৈনিক।

বখতিয়ার খলজি স্বীয় কর্মশক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন। ১১৯৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নিজ জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে জীবিকার অন্বেষণে গজনিতে আসেন। সেখানে তিনি শিহাবুদ্দিন ঘোরির সৈন্য বিভাগে চাকরি পাননি। দেখতে খাটো, অস্বাভাবিক লম্বা হাত এবং কদাকার চেহারার জন্য বখতিয়ার সেনা কমান্ডারের দৃষ্টি পাননি। এরুপ শারীরিক বৈশিষ্ট্য তুর্কিদের নিকট অমঙ্গল বলে বিবেচিত হতো। গজনিতে সফলতা না পেয়ে বখতিয়ার দিল্লিতে সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেকের দরবারে উপস্থিত হন। এবারো তিনি চাকরি পাননি। এরপর তিনি বদাউনে যান। সেখানকার শাসনকর্তা মালিক হিজবরউদ্দিন তাকে মাসিক বেতনে সৈন্য বিভাগে নিযুক্ত করেন। কিন্তু, উচ্চাভিলাষী বখতিয়ার এ ধরনের সামান্য বেতনভোগি সৈনিকের পদে সন্তুষ্ট থাকতে পারেনি। অল্পকাল পর তিনি বদাউন ত্যাগ করে অযোধ্যা যান। সেখানকার শাসনকর্তা হুসামউদ্দিনের অধীনে তিনি পর্যবেক্ষকের দায়ীত্তে নিযুক্ত হন। বখতিয়ারের সাহস ও বুদ্ধিমত্তায় সন্তুষ্ট হয়ে হুসামউদ্দিন তাকে বর্তমান মির্জাপুর জেলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ভাগবত ও ভিউলি নামক দুটি পরগনার জায়গির দান করেন। সেখানে বখতিয়ার তাঁর ভবিষ্যৎ উন্নতির পথ খুজে পান। ভাগবত ও ভিউলি তাঁর শক্তিকেন্দ্র হয়ে ওঠে।

বিহার বিজয়

বখতিয়ার অল্পসংখ্যক সৈন্য সংগ্রহ করে পার্শ্ববর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিন্দু রাজ্য আক্রমন ও লুণ্ঠন করতে শুরু করেন। এ সময়ে তাঁর বিরত্তের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মুসলমান তাঁর সৈন্যদলে যোগদান করে। ফলে বখতিয়ারের সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এভাবে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আক্রমন চালিয়ে তিনি দক্ষিণ বিহারে এক প্রাচীরঘেরা দুর্গের মতো স্থানে আসেন এবং আক্রমন করেন। প্রতিপক্ষ কোন বাঁধাই দিল না। দুর্গ জয়ের পর তিনি দেখলেন যে, দুর্গের অধিবাসীরা সকলেই মুণ্ডিত মস্তক এবং দুর্গটি বইপত্রে ভরা। জিজ্ঞাসা করে তিনি জানতে পারলেন যে, তিনি এক বুদ্ধবিহার জয় করেছেন। এটি ছিল ওদন্দ বিহার। এ সময় থেকেই মুসলমানেরা এ স্থানের নাম দিল বিহার। আজ পর্যন্ত তা বিহার নামে পরিচিত।বিহার জয়ের পর বখতিয়ার অনেক ধনরত্নসহ দিল্লীর সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেকের সাথে সাক্ষাত করেন।

বাংলা বিজয়

তৎকালীন বাংলার রাজা লক্ষণ সেন বাংলার রাজধানী নদিয়ায় অবস্থান করছিলেন কারণ নদিয়া ছিল বহিঃশত্রুর কাছ থেকে সবচেয়ে সুরক্ষিত অঞ্চল। বলা হয়ে থাকে যে নদিয়ায় আসার কিছু আগে রাজসভার কিছু দৈবজ্ঞ পণ্ডিত তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে এক তুর্কি সৈনিক তাকে পরাজিত করতে পারে। এতে করে লক্ষণ সেনের মনে ভীতির সঞ্চার হয় এবং নদিয়ার প্রবেশপথ রাজমহল ও তেলিয়াগড়ের নিরাপত্তা জোরদার করেন। লক্ষণ সেনের ধারণা ছিল যে ঝাড়খণ্ডের শ্বাপদশংকুল অরণ্য দিয়ে কোনো সৈন্যবাহিনীর পক্ষে নদিয়া আক্রমণ করা সম্ভব নয় কিন্তু বখতিয়ার সেইপথেই তার সৈন্যবাহিনীকে নিয়ে আসেন। নদিয়া অভিযানকালে বখতিয়ার ঝাড়খণ্ডের মধ্য দিয়ে এত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়েছিলেন যে তার সাথে মাত্র ১৭ জন সৈনিকই তাল মেলাতে পেরেছিলেন। বখতিয়ার সোজা রাজা লক্ষণ সেনের প্রাসাদদ্বারে উপস্থিত হন এবং দ্বাররক্ষী ও প্রহরীদের হত্যা করে প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করেন। এতে প্রাসাদের ভিতরে হইচই পড়ে যায় এবং লক্ষণ সেন দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলে প্রাসাদের পেছনের দরজা দিয়ে নৌপথে বিক্রমপুরে আশ্রয় নেন।

নদিয়া জয় করে পরবর্তীতে লক্ষণাবতীর (গৌড়) দিকে অগ্রসহ হন এবং সেখানেই রাজধানী স্থাপন করেন। এই লক্ষণাবতীই পরবর্তীকালে লখনৌতি নামে পরিচিত হয়।গৌড় জয়ের পর আরও পূর্বদিকে বরেন্দ্র বা উত্তর বাংলায় নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি এলাকাগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে একজন করে সেনাপতিকে শাসনভার অর্পণ করেন। বখতিয়ারের সেনাধ্যক্ষদের মধ্যে তিনজনের নাম পাওয়া যায়। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সুবেদার আওলিয়া খাঁ পূর্ব ভারতের বঙ্গ এলাকা, আলী মর্দান খলজি বরসৌলে, হুসামুদ্দিন ইওজ খলজি গঙ্গতরীর শাসনকর্তা নিযুক্ত হন।

 ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির ১৭ জন অগ্রগামীর মধ্যে অন্যতম ছিলেন আফগানিস্থানের গরমশিরের অধিবাসী বখতিয়ারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুবেদার আউলিয়া খাঁ। তিনি মুলতঃ খলজি কর্তৃক পূর্ব ভারতের বঙ্গ এলাকার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। মৃত্যুকাল পর্যন্ত সুবেদার আউলিয়া খাঁ বঙ্গ এলাকার শাসনকর্তা হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। পরবর্তীতে তার বংসধরেরা বংসপরম্পরায় এই এলাকা শাসন করেন। আউলিয়া খাঁ ১২০৬ সনে তাঁর প্রিয় বন্ধু বখতিয়ার খলজিকে স্বরণীয় করে রাখতে বর্তমান ভাওয়াল গাজীপুরের কালীগঞ্জ থানার বখতিয়ারপুর এলাকার নামকরণ করেছিলেন। যা বর্তমানে বক্তারপুর এলাকা হিসেবে পরিচিত। সেই সময় বখতিয়ারপুরে আউলিয়া খাঁ তার প্রাশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করেন। বসবাসের জন্য চমৎকার হওয়ায় তিনি পার্শ্ববর্তী ফুলহরী এলাকায় (যা বর্তমান ফুলদী গ্রাম) বসতি স্থাপন করেন। তথ্যসূত্রে জানাযায়, সুবেদার আউলিয়া খাঁর বংসধর সার্কেল ইন্সপ্যাক্টর অব পুলিশ মুন্সী মুহাম্মদ ছরওয়ার খাঁ (তৎকালীন রূপগঞ্জ সার্কেল) বৃটিশ ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে ফুলহরী নাম পরিবর্তন করে ফুলদী নামকরণ করেন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভারতবর্ষে পর্তুগীজ আগমনের ইতিবৃত্তঃ- একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা।

প্রাচীনকাল থেকেই বৃহত্তর বঙ্গদেশ( বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম ) ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের এক অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। বাঙলার ক্ষেতের অফুরন্ত ফসল এবং তাঁতিদের হাতে বোনা কাপড়,ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধনসম্পদের লোভে যুগ যুগ ধরে দেশ-বিদেশের বণিকরা ছুটে এসেছে এই দেশে।ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ইউরোপীয় বণিকদের আনাগোনা শুরু হয় এই বাঙলায়। ইউরোপীয়দের মধ্যে সমুদ্রপথে পর্তুগিজরাই প্রথম বাঙলায়, তথা ভারতীয় উপমহাদেশে এসে পৌঁছায় ও বাংলাসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ করে। মুঘল সম্রাট আকবরের অনুমতিবলে হুগলীতে তারা পর্তুগিজ বন্দর-নগরী পত্তন করেছিল। সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে হুগলী ছিল বাঙলার অন্যতম প্রধান এক নগরী।তবে এখানে এসে তারা পরবর্তীসময়ে হার্মাদগিরি করার ফলে সম্রাট শাহজাহান সহ পরবর্তী সম্রাটদের বিরাগভাজনের কারন হন তারা।এসব বিভিন্ন কারণে সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে পর্তুগিজরা হুগলী ছেড়ে চলে যেতে শুরু করলে সেই স্থান দখল করে ইংরেজ ও ওলন্দাজরা । কিন্তু এখনো একটু খোঁজ করলেই হুগলীর পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায় – হয়ত কোন একটা এলাকার নাম, অথবা কোন একটা...

"জয়নগরের মোয়া-উপাখ্যান"

শীতকাল এলেই বাঙালীর যেটা সবার আগে মাথায় আসে তা হল নলিনগুড়,পিঠেপুলি,আর জয়নগরের মোয়া।এগুলো ছাড়া চলবেই না।আমরা সকলেই এইসব বিভিন্ন খাদ্যের সাথে পরিচিত।আজ এরকমই এক সুস্বাদু মিষ্টান্ন "জয়নগরের মোয়া" -র ইতিবৃত্ত তুলে ধরছি আমার ছোট্ট প্রবন্ধ-পটে।ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন। ইতিহাসের সাথে ভূগোলের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়।ভূগোল ছাড়া ইতিহাস সম্ভব নয়,সুতরাং ভৌগলিক দিক থেকে জয়নগর মজিলপুর হলো দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ছোট্ট একটা গ্রাম। প্রায় পাঁচশো বছর আগে আদি-গঙ্গা এইখান দিয়ে বয়ে বয়ে মিশে গিয়েছিলো বঙ্গোপসাগরে। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর শিষ্যদেরকে নিয়ে নীলাচলে যাবার সময় এখানে থেমে ছিলেন। সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় পরিপুষ্ট এই অঞ্চলটিকে অনেকেই পশ্চিম বাংলার 'দ্বিতীয় নবদ্বীপ' বলেও অভিহিত করে থাকেন। মোটামুটিভাবে ধরা হয়,১৯২৯ সাল নাগাদ এই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ দুই ব্যক্তি নৃত্যগোপাল সরকার (বুচকি বাবু) এবং পূর্ণচন্দ্র ঘোষ, দু'জনে মিলে সর্বপ্রথম 'মোয়া' নামক লোভনীয় মিষ্টান্নটির জন্ম দেন। তারপর সেই মোয়ার সুস্বাদ, সুঘ্রাণ আর গুণ ক্রমে ক্রমে সারা পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই, এ...

"কালাপাহাড়"- ইতিহাসে একজন ধ্বংসকারী হিসাবে পরিচিত

প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গল্পে একটি বিধ্বংসী মোষের নাম দিয়েছিলেন কালাপাহাড়। কে জানে কেন এমন নামকরণ! মোষ সে কালো, সে ভেঙেচুরে ফেলে—তাতে কালো হতে পারে। কিন্তু কালা তো বধির—যে কানে শুনতে পায় না। তাহলে যার কানে ভালো কথা প্রবেশ করে না—সে-ই ‘কালা’। কখনও কখনও পাহাড় কালো রঙের হয়, বিশাল চেহারার কাউকে আমরা পাহাড়ের সঙ্গে তুলনাও করে থাকি। বিরাট আকারের কালো রঙের মহিষ—কালাপাহাড়? কিন্তু এই কথাটা মনে এলেই মনে পড়ে এটা একজন বিরাট চেহারার দস্যু— যে ধর্ম মানে না— ধর্মস্থান গুঁড়িয়ে ফেলে লুঠতরাজ চালায় আর বড্ড গোঁয়ার গোবিন্দ। পাষাণের মতোই তার কঠিন মন— কারও কথায় কান দেয় না।একজায়গায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন এমন লোকের কথা ভেবেই—‘পিতামহের কীর্তির প্রতি কালাপাহাড়ি করা।’ তাহলে বোঝাই যাচ্ছে যে,লোকটা মোটেই সুবিধের ছিল না— সব কিছু ভেঙেচুরে নষ্ট করে ফেলাতেই যার প্রবল আনন্দ।তবে এর পিছনেও নির্দিষ্ট কারণ ছিল,ছিল হিন্দুধর্মের গোঁড়ামি,রক্ষণশীলতা,অস্পৃশ্যতা। তবে পরিচয়য়ের দিকে যাওয়া যাক এবার। কালাপাহাড় (১৫৩৪-১৫৮০ ) ছিলেন কররানী রাজবংশর এক দুর্ধর্ষ সেনাপতি। তার বাড়ি ছিল অধুনা বাংল...