সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

"জয়নগরের মোয়া-উপাখ্যান"

শীতকাল এলেই বাঙালীর যেটা সবার আগে মাথায় আসে তা হল নলিনগুড়,পিঠেপুলি,আর জয়নগরের মোয়া।এগুলো ছাড়া চলবেই না।আমরা সকলেই এইসব বিভিন্ন খাদ্যের সাথে পরিচিত।আজ এরকমই এক সুস্বাদু মিষ্টান্ন "জয়নগরের মোয়া"-র ইতিবৃত্ত তুলে ধরছি আমার ছোট্ট প্রবন্ধ-পটে।ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন।

ইতিহাসের সাথে ভূগোলের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়।ভূগোল ছাড়া ইতিহাস সম্ভব নয়,সুতরাং ভৌগলিক দিক থেকে জয়নগর মজিলপুর হলো দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ছোট্ট একটা গ্রাম। প্রায় পাঁচশো বছর আগে আদি-গঙ্গা এইখান দিয়ে বয়ে বয়ে মিশে গিয়েছিলো বঙ্গোপসাগরে। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর শিষ্যদেরকে নিয়ে নীলাচলে যাবার সময় এখানে থেমে ছিলেন। সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় পরিপুষ্ট এই অঞ্চলটিকে অনেকেই পশ্চিম বাংলার 'দ্বিতীয় নবদ্বীপ' বলেও অভিহিত করে থাকেন।

মোটামুটিভাবে ধরা হয়,১৯২৯ সাল নাগাদ এই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ দুই ব্যক্তি নৃত্যগোপাল সরকার (বুচকি বাবু) এবং পূর্ণচন্দ্র ঘোষ, দু'জনে মিলে সর্বপ্রথম 'মোয়া' নামক লোভনীয় মিষ্টান্নটির জন্ম দেন। তারপর সেই মোয়ার সুস্বাদ, সুঘ্রাণ আর গুণ ক্রমে ক্রমে সারা পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই, এমন কি ভারতের অন্যান্য প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। অরিজিনাল 'জয়নগরের মোয়া' তৈরীতে 'কনকচুড়' নামে এক বিশেষ ধরণের চালের খই ব্যবহার করা হয়৷

দীর্ঘদিন ধরে এই জোড়া হাতিয়ার নিয়েই শীতের বঙ্গদেশে মোয়ার বাজার মাত করছে জয়নগর। এ বার জয়নগরের সেই একাধিপত্যে থাবা বসাতে কোমর বেঁধেছে পাশের বহড়ু। তবে দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই তল্লাট জুড়ে এ বার ছেয়ে গিয়েছে পোস্টার-প্ল্যাকার্ড ‘বহড়ুর মোয়া’।কলকাতা থেকে বারুইপুর, সেখান থেকে জয়নগর ঢোকার আগেই পড়ে ছোট্ট জনপদ বহড়ু। সেখানকার কারিগররা দাবি করছেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরাই কনকচূড় ধান এবং ভাল মানের নলেন গুড়ের মিশেলে মোয়া তৈরি করে আসছেন। যে মোয়ার জনক এই এলাকারই ‘যামিনীবুড়ো’। যিনি বাড়িতে এক অনুষ্ঠানে নিজের খেতের কনকচূড় ধানের খইয়ে নলেন গুড় মাখিয়ে মোয়া তৈরি করে পরিবেশন করেছিলেন। সেই মোয়া পরে জনপ্রিয় হওয়ায় তৈরির পদ্ধতি শিখে নাম কিনেছেন জয়নগরের কারিগররা। লোকে চিনেছে ‘জয়নগরের মোয়া’। অথচ, বঞ্চিত থেকে গিয়েছে বহড়ু। তার প্রতিবাদেই এ বার এত প্রচার এবং হৃতসম্মান ফিরে পাওয়ার চেষ্টা।
জয়নগরের মোয়া কারিগররা অবশ্য বহড়ুর মোয়া কারিগরদের দাবি মানতে নারাজ। তাঁদের দাবি, মোয়া দীর্ঘদিন ধরে জয়নগরেই বানানো হচ্ছে। এলাকারই নামটাই মোয়ার আগে জুড়ে গিয়েছে। তবে, বহড়ুর মোয়া নিয়ে কোনও বিরূপ মন্তব্যও তাঁরা করেননি। তাঁদের কথায়, “ওঁরা (বহড়ুর মোয়া কারিগর) ওঁদের মতো করে ব্যবসা করুক না, আপত্তির কী আছে? ওদের মোয়ারও যদি আমাদের মোয়ার মতো স্বাদ-গন্ধ হয়, তা তো ভালই।”

★★এবার জেনে নেওয়া যাক যে,কী ভাবে জয়নগর-বহড়ুতে মোয়া শিল্প জমে উঠলঃ-

মোয়া ইতিবৃত্ত ঘেঁটে দেখলে দেখা যাবে যে,দুই এলাকার মোয়া ব্যবসায়ী ও কারিগররা এ ব্যাপারে একই তথ্য দিয়েছেন। জয়নগর-বহড়ু ছাড়াও দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলপি, কাকদ্বীপ, নামখানা এলাকায় প্রায় ৪০০ বিঘা জমিতে কনকচূড় ধানের চাষ হয়। অন্য জেলায় এই ধানের চাষ ততটা হয় না। শীতকালে সেই ধান থেকে খই তৈরি করা হয়। এখানকার নলেন গুড়ও উন্নত মানের। বড় কড়াইয়ে নলেন গুড় জ্বাল দেওয়া হয়। অল্প গরম গুড়ে কনকচূড় ধানের খই ফেলা হয়। ধীরে ধীরে খইয়ের সঙ্গে নলেন গুড় মেশানো হয়। তারপর ওই গুড়মাখা খই ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার পর ভাল ঘি ও এলাচ গুঁড়ো মাখিয়ে মোয়া বাঁধা হয়। প্রায় সাত দিন মোয়া তাজা থাকে। মুখে দিলে গলে যায়। অন্য জেলায় এই দুইয়ের মিশেল সম্ভব নয়। তাই অন্যত্র এত ভাল মানের মোয়া হয় না। সাধারণ খইয়ের মোয়া শক্ত হয়। মুখে দিয়ে গলে না। অন্যত্র এখন মোয়াতে নানা কৃত্রিম গন্ধ প্রয়োগ করা হয়। সে ক্ষেত্রে অবিকল জনগর-বহড়ুর মোয়ার গন্ধ পাওয়া গেলেও স্বাদে তা ধারে-কাছে আসে না।
ব্যবসায় প্রতিযোগিতা এসে যাওয়ায় জয়নগর এবং বহড়ু দু’জায়গাতেই এখন মোয়ার উপরে কিসমিস ও ক্ষীর দেওয়া হচ্ছে। এতে স্বাদ আরও বাড়ে বলে কারিগরদের দাবি।গুড়ের গুণমান অনুযায়ী জয়নগর বা বহড়ুর মোয়ার দাম কেজিপ্রতি ১২০-১৬০ টাকা। জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও পরিকাঠামোর অভাবের জন্য ‘জয়নগরের মোয়া’ এখনও রাজ্যের সর্বত্র পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে না বলে আক্ষেপ করেছেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা। 

এক ব্যবসায়ীর কথায়, “আমাদের মোয়ার চাহিদা রয়েছে। ২০০ জন কারিগর রাতদিন পরিশ্রম করেন। কিন্তু তা সর্বত্র সরবরাহ করা সম্ভব নয়। হাতে মাত্র তিন মাস সময় পাওয়া যায়।”ঠিক এ জায়গাটাই এ বার ধরতে চাইছে বহড়ু। ওই এলাকার ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, আর কয়েক বছরের মধ্যে ‘জয়নগরের মোয়া’র মতোই জনপ্রিয় হবে ‘বহড়ুর মোয়া’। যে জনপ্রিয়তা আগেই পাওয়া উচিত ছিল, তার জন্যই এ বার থেকে কোমর বেঁধছে বহড়ুও। সেখানেও প্রায় ২০০ জন কারিগর শীতের তিন মাস রাতদিন মোয়া তৈরি করে চলেছেন।জয়নগরে ঢোকার আগেই পড়ে ছোট্ট জনপদ বহড়ু। কনকচূড় ধান এবং ভাল মানের নলেন গুড়ের মিশেলে সেই অপূর্ব স্বাদের মোয়ার জন্ম এ গ্রামেই। বাস যোগাযোগ তেমন না থাকায় ট্রেনে যাওয়াই সুবিধা। ফাঁকা ফাঁকা ষ্টেশনে নেমে ভ্যান রিকশা চেপে যাওয়া যায় বহড়ু বাজার। শোনা যায় এই মোয়ার জনক এই এলাকারই ‘যামিনীবুড়ো’। যিনি বাড়িতে এক অনুষ্ঠানে নিজের ক্ষেতের কনকচূড় ধানের খইয়ে নলেন গুড় মাখিয়ে মোয়া তৈরি করে পরিবেশন করেছিলেন। তারপর, বাকিটা তো ইতিহাস।
 স্থানীয় বাসিন্দা শেখ রফিকের কথায় একটু তিনি একটু করে বহড়ুকে বেড়ে উঠতে দেখেছেন। জয়নগর-বহড়ু ছাড়াও দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলপি, কাকদ্বীপ, নামখানা এলাকায় প্রায় পাঁচশো বিঘা জমিজুড়ে কনকচূড় ধানের চাষ হয়। অন্য জেলায় এই ধানের চাষ সেভাবে হয় না। শীতকালে এই কনকচূড় ধান থেকে খই তৈরি করা হয়। এখানকার নলেন গুড়ও উন্নত মানের। বড় কড়াইয়ে নলেন গুড় জ্বাল দেওয়া হয়। অল্প গরম গুড়ে কনকচূড় ধানের খই দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে সেই খইয়ের সঙ্গে মিশতে থাকে নলেন গুড়। তারপর ওই গুড়মাখা খই ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার পর ভাল ঘি ও এলাচ গুঁড়ো মাখিয়ে মোয়া তৈরি হয়। সপ্তাহব্যাপী এই মোয়া তাজা থাকে। নরম খইয়ের মোয়া মুখে দিলে গলে যায়।

অন্য জেলায় কনকচূড় ধান এবং উন্নত মানের নলেনগুড় একত্রে মেলে না। তাই অন্যত্র এত ভাল মানের মোয়াও হয় না। সাধারণ খইয়ের মোয়া শক্ত হয়, সেই স্বাদ গন্ধও আসে না। অন্য জায়গায় এই মোয়া তৈরি হলেও তাতে কৃত্রিম গন্ধ প্রয়োগ করা হয়। সে ক্ষেত্রে বহড়ুর মোয়ার গন্ধ পাওয়া গেলেও স্বাদে তা ধারে-কাছে আসে না। সৌন্দর্য এবং স্বাদ বাড়াতে এখন মোয়ার উপরে কিসমিস ও ক্ষীর দেওয়া হচ্ছে।

সেকানকার নিউ বীণাপাণি মিষ্টান্ন ভান্ডারের পরেশ দাসের কথায় বহড়ুতে মোয়ার বহু প্রস্তুতকারক বা দোকান থাকলেও বীণাপাণি বা শ্যামসুন্দরের নামই সবচেয়ে আগে আসে। এদের মধ্যে আবার বীণাপাণি মিষ্টান্ন ভান্ডার প্রাচীন। প্রায় ১০০ বছরেরও পুরনো এই দোকানের মোয়া বিখ্যাত। সম্প্রতি বাপ দাদার দোকান ছেড়ে নতুন দোকান করেছেন পরেশ। অল্প কদিনে সেই দোকানও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। পাশাপাশি জনপ্রিয় রঞ্জিত ঘোষ, বাবলু ঘোষের শামসুন্দর মিষ্টান্ন ভান্ডারও। এদের কাছ থেকে উন্মোচিত হয় মোয়ার নামের পেছনে জয়নগরের রহস্যটি। আসলে বহড়ু প্রাচীন জনপদ হলেও বহু বছর আগে এখানে তেমন বড় বাজার ছিল না। তাই মোয়া নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে হত জয়নগরের হাটে। যারা হাট থেকে মোয়া কিনে নিয়ে যেতেন তাদের মুখেই ক্রমশ জয়গরের নাম ছড়িয়ে যায়। তখন এখনকার মত সুদৃশ্য প্যাকেট বা বাক্সও পাওয়া যেত না। তাই মোয়া তৈরি করলেও বহড়ুর নাম থেকে গেল অন্ধকারেই। পরেশবাবুর দাবী বছর দশেক আগে বীণাপাণির মহাদেব দাস প্রথম তাদের দোকানের বাক্সে জয়নগরের নাম বাদ দিয়ে বহড়ুর মোয়ার উল্লেখ করেন। তারপর তো এখন প্রায় সব দোকানই তাদের মোয়ার বাক্সের গায়ে বহড়ুর মোয়া বলেই উল্লেখ করে।জয়নগরেও অবশ্য এখন মোয়া তৈরি হচ্ছে, কিন্তু মোয়ার বনেদিয়ানা বহড়ুতেই

আশপাশের এলাকায় দু’জায়গার মোয়াই রমরমিয়ে বিক্রি হচ্ছে। কোনটা বেশি ভাল? দুই মোয়ায় কামড় দিয়ে এক মোয়া-রসিকের ছোট্ট উত্তর হবে "আহা দুটোই!"
                            ------------------------

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন