প্রাচীনকাল থেকেই বৃহত্তর বঙ্গদেশ(বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম) ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের এক অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। বাঙলার ক্ষেতের অফুরন্ত ফসল এবং তাঁতিদের হাতে বোনা কাপড়,ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধনসম্পদের লোভে যুগ যুগ ধরে দেশ-বিদেশের বণিকরা ছুটে এসেছে এই দেশে।ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ইউরোপীয় বণিকদের আনাগোনা শুরু হয় এই বাঙলায়। ইউরোপীয়দের মধ্যে সমুদ্রপথে পর্তুগিজরাই প্রথম বাঙলায়, তথা ভারতীয় উপমহাদেশে এসে পৌঁছায় ও বাংলাসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ করে। মুঘল সম্রাট আকবরের অনুমতিবলে হুগলীতে তারা পর্তুগিজ বন্দর-নগরী পত্তন করেছিল। সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে হুগলী ছিল বাঙলার অন্যতম প্রধান এক নগরী।তবে এখানে এসে তারা পরবর্তীসময়ে হার্মাদগিরি করার ফলে সম্রাট শাহজাহান সহ পরবর্তী সম্রাটদের বিরাগভাজনের কারন হন তারা।এসব বিভিন্ন কারণে সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে পর্তুগিজরা হুগলী ছেড়ে চলে যেতে শুরু করলে সেই স্থান দখল করে ইংরেজ ও ওলন্দাজরা। কিন্তু এখনো একটু খোঁজ করলেই হুগলীর পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায় – হয়ত কোন একটা এলাকার নাম, অথবা কোন একটা পদবী, বা হয়ত কোন একটা খাবারের স্মৃতিতে, কোন ধ্বংসস্তূপের পাঁচিলের পুরনো ইটে, বা কোন পুরানো গীর্জার ছায়াচ্ছন্ন অলিন্দে এখনো ঘুমিয়ে আছে পর্তুগিজদের স্মৃতি। আজ আমি আলোচনা করব পর্তুগিজরা কিভাবে বাঙলায় এসে পৌঁছাল, সেই গল্পে। তবে সে ইতিহাস জানার আগে পর্তুগিজদের সমুদ্রযাত্রার ইতিহাস সম্পর্কে দু-এক কথা বলে নেওয়া জরুরী।
পর্তুগিজদের সমুদ্রযাত্রা শুরুর সময়টা ১৫শ শতকের শুরুর দিকে। পৃথিবীর মানচিত্র তখনো ভালো করে আঁকা হয়ে ওঠেনি। আমেরিকা নামে যে দুটি গোটা মহাদেশ আছে মানুষ তখনো জানেনা। ১৪১৫ সালের অগাস্ট মাসে রাজা প্রথম জনের (João I) নেতৃত্বে পর্তুগালের সেনা অতর্কিতে আক্রমণ করে জয় করে নিল জিব্রাল্টার প্রণালীর মুখে মরক্কোর স্যিউতা (Ceuta)। এর আগে বহুদিন ধরে স্যিউতা ছিল আফ্রিকার একাধিক মুসলমান শাসকের অধীনে। এই মুসলমান ক্ষমতাগুলি স্যিউতার ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা নিয়ে স্পেন এবং পর্তুগালের উপকূল অঞ্চলের সমুদ্রে যথেচ্ছ জলদস্যুতা চালাত। পর্তুগালের স্যিউতা আক্রমণের মূল কারণ ছিল এই জলদস্যুদের বিতাড়িত করে ভূমধ্যসাগরের ব্যাবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা। এই যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন যুবরাজ হেনরি, যাকে পরে সারা দুনিয়া চিনেছিল ‘হেনরি দি ন্যাভিগেটর’ (Henry the Navigator) নামে। স্যিউতার এই জয় তাঁর মনে নতুন দেশ আবিষ্কারের নেশা ধরিয়ে দিল।
ইউরোপের ভৌগোলিকরা তখন মনে করতেন আফ্রিকার উপকূল গিয়ে ঠেকেছে সরাসরি দক্ষিণ গোলার্ধে। এশিয়ায় তখন অটোমান (তুর্কি), সাফাবিদ (ইরান), মুঘল (উত্তর-পশ্চিম ভারত), বিজয়নগর (দক্ষিণ ভারত) এবং আরো পূর্ব দিকে চীনের মিং ও কুইং রাজত্ব, জাভার মাতারাম ইত্যাদি প্রধান চালিকা শক্তিগুলি কার্যকর ছিল। এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে তখন ইউরোপের বাণিজ্য চলত পারস্য উপসাগর হয়ে স্থলপথে অটোমান রাজ্যের মধ্যে দিয়ে ভূমধ্যসাগরের নানা প্রান্তে। এই বাণিজ্যপথে বহুকাল ধরে একচেটিয়া রাজত্ব ছিল আরব বণিকদের। ইউরোপের বাজারে তখন গোলমরিচ ও অন্যান্য মশলার দারুণ চাহিদা। কেবল রান্নার জন্যই নয়, খাদ্য সংরক্ষণ (প্রিজারভেটিভ), ওষুধপথ্য তৈরি ও ধর্মীয় কারণেও প্রচুর পরিমাণ মশলার প্রয়োজন হত। আরব বণিকরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতের উপকূল থেকে মশলা নিয়ে এসে মহার্ঘ মূল্যে বিক্রি করত ভেনিসিয় (ইতালিয়ান) বণিকদের কাছে, আর আলেকজান্দ্রিয়া (ইজিপ্ট) ও সিরিয়া থেকে ভেনিসিয় বণিকদের হাত ধরে এই সমস্ত মশলা চলে যেত ইউরোপের বাজারে। বলা বাহুল্য, পর্তুগিজরা এই মশলার সিনে এন্ট্রি নেওয়ার আগে পর্যন্ত এই ইজিপশিয় ও ভেনিশিয় বণিকদের হাতেই ছিল ইউরোপের মশলার বাজারের যুগ্ম-মোনোপলি।
পর্তুগাল দেশটির অবস্থা তখন একেবারেই ভালো নয়। আর্থ-সামাজিক দিক থেকে দেখলে পর্তুগালকে সেসময় ইউরোপের বেশ গরীব দেশ বললেও অত্যুক্তি হয়না। লিসবন তখন ইউরোপের বাকি শক্তিগুলির ধারেকাছেও আসেনা। কিন্তু কেবলমাত্র একটি ভিশনারি আইডিয়ার কারনে তারা পরবর্তী শতাব্দীতে ইউরোপের বাজারে হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।আর সেই আইডিয়াটি হলো সমুদ্রপথে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তার সন্ধান করা ও এই পথে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করা। আইডিয়াটি চিত্তাকর্ষক হলেও সেই পথে ছিল অনেক বাধা। এক তো সমুদ্রপথের সুলুকসন্ধান তখন ইউরোপীয়দের কাছে সম্পূর্ণ অজানা, উপরন্তু দেশের ক্যাথলিক চার্চের এতে ছিল প্রবল আপত্তি। কারণ রাজশক্তি যদি সমুদ্রযাত্রার উদ্দেশ্যে টাকা-পয়সা খরচা করতে শুরু করে, তাতে ক্যাথলিক চার্চের বহুল প্রচারিত ‘ফ্ল্যাট আর্থ থিওরি’ সংকটে পড়ে যেতে পারে।
কিন্তু এই সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে কেবলমাত্র অসীম সাহসকে সম্বল করে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখলেন হেনরি। স্যিউতার সাফল্যের পর তিনি পর্তুগালের স্যাগরেস (Sagres) নামক শহরে নৌবিদ্যা নিয়ে গবেষণার জন্য এক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করলেন। অচিরেই যুবরাজ হেনরির নৌ-গবেষণা কেন্দ্রে তৈরি হল নতুন ধরনের এক জাহাজ –যার নাম ছিল ক্যারাভেল (Caravel) – অপেক্ষাকৃত হাল্কা, দুই বা তিনটি পালওয়ালা দ্রুতগামী জাহাজ। আর এই জাহাজে চেপে পর্তুগিজ অভিযাত্রীরা অ্যাটলান্টিকের মাঝে আবিষ্কার করতে লাগল একের পর নতুন নতুন দ্বীপপুঞ্জ। খোঁজ পাওয়া গেল মাদেইরা (Madeira), অ্যাজোরেস (Azores) ইত্যাদি দ্বীপপুঞ্জের। ক্রমে পনেরশ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ পর্তুগিজ নাবিকরা প্রথমে পশ্চিম আফ্রিকার কেপ বোসাদর দ্বীপপুঞ্জ ও পরে কেপ বোসাদর পেরিয়ে কেপ ভেরদে দ্বীপপুঞ্জে পর্যন্ত পৌঁছে গেল। আফ্রিকার মাটিতে তৈরি হলো প্রথম ইউরোপিয়ান কলোনি যেখান থেকে যথেচ্ছভাবে দাস ব্যবসা চলতে লাগল।
১৪৬০ সালের মধ্যেই যুবরাজ হেনরি, দি ন্যাভিগেটরের অধীনস্থ পর্তুগিজ নাবিকরা পাড়ি দিতে লাগল আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে আরো দক্ষিণে আরগুইম, সেনেগাল, গাম্বিয়া প্রভৃতি স্থানে। সোনা দানা সম্পদের পাশাপাশি তারা আফ্রিকার অসংখ্য আদিবাসী মানুষকে বন্দী করে ক্রীতদাস বানিয়ে দেশে নিয়ে আসতেন ও ইউরোপের বাজারে বিক্রি করে দিতেন। আরগুইমে স্থাপিত হয় পর্তুগিজ দুর্গ। তৈরি হয় উন্নততর ক্যারাভেল যা আরো দ্রুতগামী এবং আরো বেশি পণ্যদ্রব্য বইতে পারে। কিন্তু এশিয়ার সামুদ্রিক পথ তো দূরের কথা, আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের খোঁজও তখনো পাওয়া যায়নি। পাওয়ার কথাও নয়, কারন এই রাস্তা ছিল আরব বণিকদের ‘ট্রেড সিক্রেট’ যা তারা বাইরের কাউকেই জানাত না।
১৪৮৬ সালে বিখ্যাত পর্তুগিজ অভিযাত্রী বার্থেলোমিউ দিয়াজ (Bartholomeu Dias) আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে প্রথম পৌঁছলেন আফ্রিকার দক্ষিণতম প্রান্ত ‘কেপ অফ গুড হোপ’ (Cape of Good Hope), যা আজকের দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন। এর কিছুদিনের মধ্যেই ১৪৯২ সালে ভারতের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে কলম্বাস আবিষ্কার করে ফেললেন আমেরিকা মহাদেশ। যদিও ওটা যে আসলে আমেরিকা মহাদেশ তা কেউ জানত না। সকলের ধারণা ছিল ওটাই ভারত। কিন্তু লিসবনের গুপ্তচরদের সংগ্রহ করে আনা ভারতের বাণিজ্য ও সমুদ্রপথ সম্পর্কিত গূঢ় তথ্যের সঙ্গে কলম্বাসের আবিষ্কার করা নতুন তথ্য মিলছিল না। ফলে সকলের মনে দেখা দিলো বিভ্রান্তি। এইভাবে কেটে গেল আরো ৫ বছর। অবশেষে ১৪৯৭ সালে পর্তুগালের রাজা ম্যানুয়েলের (King Manoel) নির্দেশে ভাস্কো-দা-গামার ভারতযাত্রা প্রস্তুতি শুরু হলো। তৈরি হলো সাও গ্যাব্রিয়েল, সাও রাফায়েল ও সাও মিগুয়েল নামে তিনটি উন্নত ধরণের ক্যারাভেল জাহাজ। লিসবনের সবচেয়ে অভিজ্ঞ নাবিকদের এই অভিযানে নিয়োগ করা হলো। মাত্র তিনটি ক্যারাভেল ও একটি সাপ্লাই জাহাজ নিয়ে ‘সাও গ্যাব্রিয়েল’ জাহাজে (ভাস্কোর ফ্ল্যাগশিপ) চেপে ১৪৯৭ সালের ৮ই জুলাই ভারতবর্ষের উদ্দেশ্যে ভেসে পড়লেন ভাস্কো দা গামা। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল ধরে গোটা মহাদেশটিকে প্রদক্ষিণ করে পাঁচ মাস পর তিনি প্রথমে পৌঁছলেন কেপ অফ গুড হোপ, যেখান থেকে গতবার বার্থেলোমিউয়ের জাহাজ ফিরে গেছিল। সেখান থেকে আরো তিন মাসের মধ্যে মোজাম্বিক, এবং সেখান থেকে কেনিয়ার মোম্বাসা বন্দর। মোজাম্বিক থেকে মোম্বাসার মধ্যে স্থানীয় মুসলমান শাসকদের সঙ্গে একাধিকবার গণ্ডগোলে জড়িয়ে পড়লেন তারা। এরপর মোম্বাসা থেকে তিনি গেলেন মালিন্দি বন্দরে। সেখানে ফাইনাল যাত্রার প্রস্তুতিতে কেটে গেল আরো মাস দুই। এপ্রিল মাসের শুরুতে ভাস্কোর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের বার্তা নিয়ে এলো আরব সাগরের মৌসুমি বায়ু। মালিন্দি বন্দর থেকে এক গুজরাটি নাবিকের সাহায্য নিয়ে মৌসুমি বায়ুর গতিকে কাজে লাগিয়ে যাত্রা শুরুর ৩১৬ দিন পর ১৪৯৮ খ্রীষ্টাব্দের ২০শে মে তারিখে ভাস্কো-দা-গামার আর্মাডা ফ্লীট অবশেষে পশ্চিম ভারতের মালাবার উপকূলের কালিকটে পৌঁছল। পরের দিন ভাস্কোর জাহাজের একজন সহযাত্রীকে ডাঙায় পাঠানো হলো এবং প্রথমেই তার দেখা হলো দু’জন টিউনিশিয় মুসলমান বণিকের সঙ্গে।ভিনদেশী খ্রীষ্টান বণিককে দেখে তাদের মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করলেন, -“May the devil take you, what brought you here?” উত্তরে সেই নাবিক জবাব দিলেন,-“We have come to seek Christians and spices.”
অবশেষে পূর্ব এবং পশ্চিমের পৃথিবী সমুদ্রপথে যুক্ত হল, যুবরাজ হেনরির স্বপ্ন সার্থক হল, আর পৃথিবীর মানচিত্রও পাকাপাকিভাবে বদলে গেল।‘ইস্তাদো দা ইন্ডিয়া’র যাত্রা শুরু ভাস্কো–দা–গামা কালিকটে নামার পর সেখানকার স্থানীয় রাজার সঙ্গে দেখা করে পর্তুগালের সম্রাটের পক্ষ থেকে সম্মান প্রদর্শন করলেন। ভাস্কো রাজার জন্য বেশ কিছু উপহার নিয়ে এসেছিলেন, যার মধ্যে ছিল কিছু কাপড় ও পোশাক, ছটি টুপি, কিছু প্রবাল, ছটি হাত ধোয়ার বেসিন, এক পেটি চিনি, দু পিপে তেল ও দু পিপে মধু। কিন্তু সমস্যা হলো উপহারগুলি দেখে রাজ দরবারের লোকেরা হেসে খুন হলো এবং ভাস্কোকে জানিয়ে দেওয়া হলো যে এইসব মামুলি উপহার রাজাকে দেওয়ার উপযুক্ত নয়। শুধু তাই নয়, তাঁকে আরো জানানো হলো যে আরবের সাধারণ গরীব সওদাগরেরাও এরচেয়ে ঢের সম্মানজনক উপহার নিয়ে রাজার সঙ্গে দেখা করতে আসে। ভাস্কো জিজ্ঞেস করলেন কী সেই সম্মানজনক উপহার? উত্তরে জানা গেল সে উপহার আর কিছুই না, সোনা। অতঃপর শুরু হলো সেই আরবের সোনা কেনার তোরজোড়। ইতিমধ্যেই ভাস্কোর দলবলকে সরে যেতে হলো কালিকট থেকে কোচিতে। এখানে তারা প্রচুর পরিমাণে মালাবার উপকূলের মশলায় জাহাজ ভর্তি করেছিল। কিন্তু আরবের বাজারে পৌঁছে জানা গেল যে সেখানে মালাবারের মশলার কোনো চাহিদা নেই। অতএব সোনা সংগ্রহের জন্য অন্য অপশানটি বাছতে হলো। অর্থাৎ ভারতীয় কাপড়, যা সে সময় সারা বিশ্বের কাছে অন্যতম চাহিদার বস্তু ছিল। গুজরাট থেকে কাপড় কিনে সেই কাপড়ের বদলে সোনা নিয়ে আসা হলো। আর তখনই জানা গেল গুজরাট ছাড়াও ভারতের আরেক জায়গায় অনেক সস্তায় খুব উচ্চমানের কাপড় পাওয়া যায়। সে দেশের নাম বেঙ্গালা বা বাংলা।
সেবার দেশে ফিরে যাবার সময় ভাস্কো জাহাজ ভর্তি করে নিয়ে গেলেন বিভিন্ন প্রকার পণ্যদ্রব্য যার মধ্যে মালাবার উপকূলের মশলাই ছিল প্রধান। এইসব মশলা ইউরোপে বিক্রি করে অভিযানের মোট খরচের ষাট গুণ অর্থ উপার্জন করল পর্তুগাল সরকার! নতুন উদ্যমে শুরু হল ভারত এবং দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলির সাথে ব্যাবসা–বাণিজ্যের তোড়জোড়। ১৫০৩ সালে ভারতে এলেন অ্যাফোনসো দে আলবুকার্ক (Afonso De Albuquerque)। তিনি কোচির রাজাকে যুদ্ধে সাহায্য করে কোচিতে দুর্গ বানাবার অনুমতি আদায় করে নিলেন। তৈরি হল ফোর্ট এমানুয়েল (Fort Emmanuel) বা চলতি ভাষায় ফোর্ট কোচি। কুইলনের (বর্তমান কোল্লাম) সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হল পর্তুগিজদের। ধীরে ধীরে উপনিবেশ তৈরি হল ভারতের গোটা পশ্চিম উপকূল এবং দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল জুড়ে। এলেন পেদ্রো আলভারেজ কাবরাল (Pedro Alvares Cabral), ত্রিস্তাও দে কানহার (Tristao Da Cunha) মত শাসকেরা। উপনিবেশ স্থাপিত হল সিলন বা বর্তমান দিনের শ্রীলঙ্কা (১৫০৫), মাদাগাস্কার (১৫০৬), মালদ্বীপ (১৫০৭), অর্মুজ (১৫০৭), মালাক্কা (১৫০৯), সুমাত্রা (১৫০৯), মলুক্কাস (১৫১২), চীন (১৫১২) – কার্যত গোটা দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার সমস্তটা জুড়েই । ১৫১৫ সালের মধ্যে পর্তুগিজরা প্রাচ্যের পৃথিবীর সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের তিনটি সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিল – ১। মালাক্কা (Malacca) – যেখান থেকে ভারত ও চীনের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, ২। অর্মুজ (Ormuz) – যেখান থেকে পারস্য উপসাগর হয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে দিয়ে আরব বণিকরা পাড়ি দিতেন ইউরোপের বিভিন্ন আনাচে কানাচে এবং ৩। গোয়া, যেখানে আরব, পূর্ব আফ্রিকা, বাঙলা, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া, চীন এমনকি আমেরিকার বণিকরাও ভিড় জমাতেন ব্যাবসা–বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে। বলা বাহুল্য পর্তুগিজরা এই জায়গাগুলি দিয়ে যাতায়াতকারী সমস্ত জাহাজের থেকে শুল্ক (Toll) আদায় শুরু করল। খুব শীঘ্রই আরবদের ব্যাবসা–বাণিজ্যের একচেটিয়া আধিপত্য গেল ভেঙে। পর্তুগিজরা সেই স্থান দখল করল।
বাঙলার রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক অবস্থা
আগেই বলেছি, বাংলা থেকে আসা সুতি ও সিল্ক মসলিনের কথা ভাস্কোর কানে পৌঁছেছিল কালিকটে থাকা কালেই। ১৪৯৯ সালে তিনি দেশে ফিরে জানিয়েছিলেন, ‘The country (Benguala) could export quantities of wheat and very valuable cotton goods. Cloths which sell on the spot for twenty-two shillings and six pence fetch ninety shillings in Calicut.’ আলবুকার্কও বারবার পর্তুগিজ সরকারকে বাঙলায় বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনার কথা লিখে পাঠান। কিন্তু পর্তুগিজরা তখন ব্যাস্ত ছিল এশিয়ার সামুদ্রিক বাণিজ্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণক্ষমতা অর্জন করার জন্য। ১৫১৭ সালে পর্তুগিজরা প্রথম বাঙলার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য সচেষ্ট হয়। বাঙলায় তখন হোসেন শাহী রাজবংশের (১৪৯৪ – ১৫৩৮) শাসন চলছে। বাঙলার রাজধানী বর্তমান মালদার গৌড়। গঙ্গানদীর দুটি শাখার একটি মুর্শিদাবাদ থেকে পূবমুখী হয়ে প্রথমে ব্রহ্মপুত্র এবং পরে মেঘনার সাথে মিশে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছিল। এই মোহনার মুখে ছিল বন্দর শহর চট্টগ্রাম বা চিট্টাগং। গঙ্গার আরেকটি শাখা মুর্শিদাবাদ থেকে দক্ষিণমুখী হয়ে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়েছিল, একটি শাখার নাম সরস্বতী, অন্যটি ভাগীরথী বা আদি গঙ্গা। পরে গিয়ে আবার এই দুটি শাখা একত্র হয়ে আরো অনেক শাখানদীর সাথে মিশে সুন্দরবনের কাছে সমুদ্রে মিশত। এই সরস্বতী নদীর ওপর ছিল বাঙলার আরেক বন্দর শহর – সপ্তগ্রাম বা সাতগাঁ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই চট্টগ্রাম হয়ে গৌড় যাওয়া ছিল অপেক্ষাকৃত অনেক সহজ এবং তখনকার প্রধান পথ। তাই চট্টগ্রাম হয়ে ওঠে তখনকার বাঙলার অন্যতম প্রধান একটি বন্দরে। গৌড় যাবার অন্য পথটি ছিল সপ্তগ্রাম হয়ে যা ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট আভ্যন্তরীণ নদীবন্দর।
ষোড়শ শতকের শেষের দিকে হুগলী নদীর মানচিত্র। সরস্বতী নদীর যে সঙ্কীর্ণ ধারাটি এখানে দেখানো হয়েছে, সেটির উপরই ছিল সপ্তগ্রাম বা সাতগাঁ বন্দর।বাঙলায় পর্তুগিজদের অভিযান বাঙলার সাথে পর্তুগিজ বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে প্রথম সংগঠিত অভিযান হয় ১৫১৭ সালে। কিন্তু নানা কারণে সেই অভিযান শেষ পর্যন্ত বাঙলায় পৌঁছাতে পারেনি। এর বছর খানেকের মধ্যেই মালদ্বীপ থেকে বাঙলায় পাঠানো হয় জোয়াও দে সিলভিরা (D. Joao de Silveira)-কে। মালদ্বীপ থেকে বাঙলায় যাবার সময় সিলিভিরা একটি ঘটনা ঘটান, যেটি পরে তাঁর অভিযানের ভাগ্যকে আমূল বদলে দেয়। দুটি নেটিভ পণ্যবাহী জাহাজ বাণিজ্য করতে যাচ্ছিল বাঙলা থেকে গুজরাতে। সিলভিরা জাহাজ দুটি আটক করে পাঠিয়ে দেন পর্তুগিজ অধ্যুষিত কালিকটে এবং জাহাজদুটির চালকদের নিজের জাহাজে তুলে নিয়ে যাত্রা করেন চট্টগ্রাম। আটক করা জাহাজের চালকেরা সিলভিরাকে চট্টগ্রামের মুসলমান শাসকদের হাঁড়ির খবর সরবরাহ করে তাঁর বিশ্বাস অর্জন করে, কিন্তু চট্টগ্রাম পৌঁছানোমাত্র গোপনে গভর্নরকে গোটা ঘটনাটি জানায়। গভর্নর পত্রপাঠ ডাঙা থেকে সিলভিরার জাহাজ তাক করে কামান দাগতে শুরু করলে সিলভিরা কোনমতে পালিয়ে বাঁচেন। বাঙলায় পর্তুগিজদের দ্বিতীয় অভিযানও ব্যার্থ হয়। এরপর প্রায় পতি বছরই একটি করে পর্তুগিজ জাহাজ বাঙলায় পাঠানো শুরু হয়, কিন্তু কোনটিই বাঙলার সাথে সুস্থ বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। ১৫৩৩ সালে মার্টিম এফোনসো দে মেলো (Martim Affonso de Mello) চট্টগ্রাম যান। প্রথানুযায়ী তিনি এক দূতের মাধ্যমে নানাবিধ বহুমূল্য উপহার ভেটস্বরূপ গৌড়ের নবাব গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের কাছে পাঠান। বলা হয় যে এই ভেটের মধ্যে এমন কিছু উপহার ছিল যা পূর্বে পর্তুগিজরা নবাবেরই এক জাহাজ থেকে লুঠ করেছিল। নবাব তা চিনতে পেরে সেই দূতকে বন্দী করেন এবং সৈন্য পাঠিয়ে চট্টগ্রামে মার্টিম এফোনসোর দলের অর্ধেককে হত্যা করেন এবং মার্টিম এফোনসো সহ বাকি অর্ধেককে বন্দী করেন।এর কিছুদিন পরই বাঙলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদল শুরু হয়। ১৫৩৬ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের অধীন বিহারের শাসনকর্তা শের শাহ সুরি বাঙলা আক্রমণ করেন। শের শাহের বিশাল বাহিনীকে তাঁর সৈন্যদল কোনমতেই যে আটকাতে পারবেনা একথা মাহমুদ শাহ জানতেন। অসহায় নবাব বাধ্য হয়ে গোয়ার পর্তুগিজ গভর্নরের কাছে দূত পাঠিয়ে যুদ্ধে সাহায্য প্রার্থণা করলেন। তার বদলে পর্তুগিজদের চট্টগ্রাম এবং সপ্তগ্রামে দুর্গ ও বাণিজ্য কুঠি বানাবার অনুমতি দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেন। পর্তুগিজ বাহিনী যুদ্ধে আফগানদের যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শের শাহ বিপুল সেনাবাহিনী নিয়ে গৌড়ে প্রবেশ করেন এবং মাহমুদ শাহের থেকে তেরো লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা আদায় করে বিহার ফিরে যায়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মাহমুদ শাহ পর্তুগিজদের চট্টগ্রাম ও সপ্তগ্রামে ফ্যাক্টরি বা বাণিজ্য কুঠি বানাবার অনুমতি দেন। এছাড়াও এই দুই স্থানের কাস্টম হাউসের দায়িত্ব এবং প্রভূত জমি জায়গা পায় পর্তুগিজরা।
দুই দশকের চেষ্টায় বহু ঘাত প্রতিঘাতের পার করার পর ১৫৩৭ সালে অবশেষে পর্তুগিজরা ভারতবর্ষের বাঙলার বুকে শক্ত মাটি পায়। এরপর ধীরে ধীরে সপ্তগ্রামের ব্যাবসা বাণিজ্য পুরোপুরিভাবে পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, এবং আরো প্রায় চার দশক পর মুঘল সম্রাট আকবরের ফর্মানের বলে পর্তুগিজরা বাঙ্গদেশে স্থাপন করে এক নগরী।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই নগরী আজ "হুগলী" নামে পরিচিত।।
-------------
👍👍👍👍👍
উত্তরমুছুন❤️👍☺️👍
উত্তরমুছুন