সময়টা ঠিক আনুমানিক 320 খ্রিস্টপূর্বের আশেপাশে,স্থান ঝিলম নদীর ধারে,পাঞ্জাব।রাজকুমারী কর্ণেলিয়া এসেছেন ঝিলম নদীর ধারে সাথে রয়েছেন কয়েকজন সহচরি।ঝিলমের জল বয়ে চলেছে শান্ত হয়ে। বিভিন্ন ছোট বড় পাথরের মধ্যে দিয়ে। স্বচ্ছ পরিষ্কার জল।চারপাশের গাছপালা নুয়ে রয়েছে নদীর উপরে।শীতের আগমন হতে চলেছে।চারপাশে একটা মনমুগ্ধকর আবহাওয়া।সেই সময়ে এসেছেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য।একলা তিনি বেরিয়েছেন এলাকা পরিদর্শনে।অদূরে রয়েছে ছাউনি তার।নদীর ধারে আসতে তার চোখাচোখি হল এক পরমা সুন্দরী কন্যার।বেশ কয়েক পলক দেখলেন তিনি সত্যিই অপরূপা।তবে কন্যার গায়ের রঙ চুল বলে দিচ্ছে এই কন্যা আসলে এক ইউনানী।কে এই কন্যা?পরিচয় জিজ্ঞাসা করে জানা গেল তিনি হেলেনা নিকেটর তথা কর্ণেলিয়া তথা সেলুকাসের কন্যা।
সেলুকাস ছিলেন আলেক্সান্ডার এর সেনাপতি আমরা যারা ন্যুনতম ইতিহাস পড়েছি তারা প্রত্যেকেই জানি।পুরু রাজার সাথে যুদ্ধে হেরে আলেকজান্ডার ফিরে যান মেসিডনিয়া। তার বিজিত রাজ্য ভাগ করে নেয় সেনাপতিরা। তারা ছিলেন বিভিন্ন ছোট ছোট রাজ্যে ভাগ হয়ে সারাটা ভারত জুড়ে।
এরপরে ধননন্দকে পরাস্ত করে পাটলিপুত্রের রাজা হন চন্দ্রগুপ্ত।অবশ্য রাজা পুরু সহায়তা করেছিলেন এই কাজে।আলেকজান্ডার ফিরে যাবার পরে প্রায় বছর কুড়ি পেরিয়ে গিয়েছে। তার প্রধান সেনাপতি সেলুকাস এবারে বেরিয়েছেন সাম্রাজ্য বিস্তারে।এসে পৌঁছেছেন সিন্ধুর তির অবধি।চন্দ্রগুপ্ত নেমেছেন ইউনানীদের সাথে যুদ্ধে। অনেকটাই দখল মুক্ত হয়ে গেছে পাঞ্জাব প্রদেশ। তবে এখনও ইউনানীদের দখলে রয়েছে উত্তর পাঞ্জাবের কিছুটা।
এই অঞ্চলে তিনি স্থাপন করতে চান এক মহাবিদ্যালয়।গুরু চাণক্য এর উদ্দেশ্য সমর্পণ করে। অস্তি এই বিদ্যালয় নির্মাণের পুরো বেপারটা দেখে নেবে।আপাতত কাজ হচ্ছে সঠিক স্থান চয়ন করা।ঝিলম নদীর পাড়ে এই জায়গাটা খুব পছন্দ হয়েছে চন্দ্রগুপ্তের। তবে এখনো তিনি কিছু বলেন নি কাউকে।জায়গাটা ভালো করে দেখা প্রয়োজন।পাশেই রয়েছে নদী তাই জলের সমস্যা নেই।কিন্তু মহাবিদ্যালয় নির্মাণের পাথর কোথায় পাওয়া যাবে। কাছাকাছি পাহাড় থাকলে ভালো হবে। কেটে বানিয়ে নেওয়া যাবে প্রয়োজনমত অনেকদিন একলা বেরোন হয়নি।তাই তিনি বেরুলেন ঘোড়ার পিঠে।
কয়েকদিন হয়েছে তিনি দখল করেছেন এই অঞ্চল। সেই দখল করা অঞ্চলের পরিদর্শনে তিনি বেরিয়েছেন
দেখলেন তিনি কন্যাকে।খুব ভালো লেগে গিয়েছে।এরপর তিনি বেশ কয়েকবার গেলেন পর পর দিনে দেখা হল বেশ কয়েকবার।তবে চন্দ্রগুপ্ত যান সাধারণ বেশে।কন্যা জানেন না তিনি মগধের রাজা বলে।তিনি সাধারণ হয়ে থাকেন যেন ঘোড়া পরিষ্কার করতে নেমেছেন ঝিলমের জলে।কন্যা এসেছেন সুদূর মেসিডোনিয়া থেকে।ওখানেই জন্ম তার।তার পিতা সেলুকাস। বিশ্বজয়ী সম্রাট আলেকজান্ডার এর প্রধান সেনাপতি। তার তিন কন্যা।এটি হচ্ছে সবচেয়ে ছোট এবং সবচেয়ে আদরের কন্যা।
ঝিলমের ধার তার ভালোই লাগে। অনেকটা গ্রীসের মত পরিবেশ এখানে। তবে সমুদ্র নেই আশেপাশে। নেই ছোট দ্বীপগুলো। তবে রয়েছে সবুজ ভূমি,বুগিয়াল। আর নদী। বড় বড় গাছ। পরিবেশ অনেকটা গ্রীসের মতোই।
বরাবর এসে শুনেছেন তিনি এদিকের রাজা চন্দ্রগুপ্ত সম্বন্ধে। খুব বড় বীর। একলা সাতজন কেন দশজনের সাথে তিনি করতে পারেন লড়াই। এমনই বলশালী।
তাই তো তিনি সমগ্র ভারতের অধিশ্বর।মনে মনে তিনি চন্দ্রগুপ্তকে দেখার জন্য উৎসুক।কে এই বীরপুরুষ।যার রাজত্ব এত বড়। সে কত না বড় বীর হবে।তিনিও বীর সেলুকাসের কন্যা এমন একজনের সাথে বিবাহ তার করা উচিৎ, যাতে তাকে মানায়,এর জন্য তিনি চন্দ্রগুপ্ত ছাড়া উপযুক্ত আর কাউকে দেখতে পাচ্ছেন না...।
কে জানে তার মনের খবর ঈশ্বর শুনে নিয়েছেন কিনা
হঠাৎ করে একদিন এল এক দূত।দূত হচ্ছে অস্তি।এক গোপন চিঠি নিয়ে এসেছেন তিনি হেলেনার কাছে।এ তো মেঘ না চাইতে জল।অবাক হলেন হেলেনা। তবে কি এপোলো(গ্রিক দেবতা) তার মনের কথা শুনে নিয়েছেন। তাই কি এসেছে এই বার্তা...?ওদিক থেকে এল উত্তর।রাজী কন্যা।বেশ কয়েকবার পায়রার মাধ্যমে যোগাযোগ করা হল। দুজনের সম্পর্ক হচ্ছে গভীর।যদিও এখনো কন্যা দেখেননি চন্দ্রগুপ্তকে।
না এবারে আর দেরি করে উচিত হবে না।আচার্য্যকে বললেন সব কথা খুলে চন্দ্রগুপ্ত।আচার্য্য শুনলেন সব।যদিও অস্তি সব খবরই এনে দিয়েছে আগেই।তাও চন্দ্রগুপ্তের নিজের মুখ থেকে জানাটা ছিল উচিত।সব শুনলেন। গভীর চিন্তায় রইলেন তিনি।মুখে কিছু বললেন না শুধু বললেন- কদিন সময় নিয়ে বলব...।ভেবে চলেছেন আচার্য্য শুধু আজ নয় যেদিন থেকে শুনেছেন সেদিন থেকেই ভাবছেন তিনি কি কি সুবিধা রয়েছে এই সম্পর্কের কি কি অসুবিধা রয়েছে সব কিছু ভাবছেন অগ্র পশ্চাৎ সবকিছু। ভবিষ্যৎ কি...?কোনদিকে নিয়ে যেতে পারে এই সম্পর্ক পাটলিপুত্রের ভবিষ্যৎ।
আচার্য্যের পরিকল্পনায় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যর বীরত্বে ধীরে ধীরে বিস্তার হয়েছে মৌর্য্য সাম্রাজ্য। উত্তরে কাশ্মীর থেকে পাঞ্জাব হয়ে বেশ কিছুটা, দক্ষিণে মহিশুর তামিলনাড়ুর প্রায় পুরোটাই তার দখলে।এপাশে নেপাল ভুটান দুটো দেশ এখন মৌর্য্য সাম্রাজ্যের অধীন।ওদিকে অবশ্য বসে নেই সেলুকাস নিকেটর।দখল করে ফেলেছেন পার্সিয়া,ব্যাবিলন।বর্তমান আফগানিস্তান এর পরে পাকিস্তান দখল করে এসে পৌঁছেছেন সিন্ধু নদীর ধারে।তবে তিনি বিশেষ সুবিধা করতে পারছেন না পাঞ্জাবের দক্ষিণে। এদিকে রয়েছেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য। তার মৌর্য্য সাম্রাজ্য নিয়ে।চন্দ্রগুপ্তও সুবিধা করে উঠতে পারছেন না পাঞ্জাবের উত্তরে। কারণটা সেলুকস নিকেটর।
ধীরে ধীরে আচার্য্য চাণক্য চাইছেন পুরো নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতে।কিন্তু তাড়াহুড়ো আর করতে চাইছেন না।
আগের যুদ্ধগুলো থেকে অনেক শিক্ষা নিয়েছেন তিনি।
যা করতে হবে খুব ধীরে। একদম শক্ত জমিতে যেন পড়ে পা। কোন বেচাল নয়।সেলুকাস হচ্ছেন আলেকজান্ডার এর সেনাপতি।বহু বহু যুদ্ধ তিনি করেছেন। অগাধ অভিজ্ঞতা।এত সহজ হবেনা তার বিরুদ্ধে জয়। এছাড়া যদি জয় হাসিল করাও যায় লোকক্ষয় সম্পদক্ষয় বেশি হয়ে গেলে তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়বে মৌর্য্য সাম্রাজ্য।তাই এতদিন তিনি ইউনানদের যথাসম্ভব এড়িয়ে চলেছিলেন।
ভারতের অন্যদিকে তিনি মনোনিবেশ করিয়ে রেখেছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যকে সাম্রাজ্য বিস্তার করিয়ে।বিবাহ দিয়েছেন নন্দরাজ নন্দনীর সাথে।বিবাহ দিয়েছেন দুর্ধরা নামক আরেক কন্যার সাথে।
কিন্তু এবার এ কি পরিস্থিতি এ কোথায় এনে দাঁড় করাল সময় ভেবে কুল পাচ্ছেন না আচার্য্য।এদিকে দুর্ধরার পুত্র বিন্দুসার বড় হয়েছে।সবকিছু বুঝতে শিখছে। শত্রুপক্ষের দল কান ভাঙানো শুরু করে দিয়েছে তারা বলতে শুরু করেছে মাতা দুর্ধরার হত্যাকারী আচার্য্য। নেহাত মহামন্ত্রী বলে বাবা চন্দ্রগুপ্ত কিছু বলেন নি। তবে বিন্দুসার এর মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হচ্ছে অস্তি এসব খবর আগেই এনে দিয়েছে,বেশ চাপে রয়েছেন আচার্য্য...
ঘটনাটা এরকম হয়েছিল চন্দ্রগুপ্তের খাবারে খুব অল্প করে বিষ মিশিয়ে দিচ্ছেন আচার্য্য। বেপারটা খুব গোপনে করা হচ্ছে।জানেন না চন্দ্রগুপ্ত নিজেও।ধীরে ধীরে তৈরি করা হচ্ছে চন্দ্রগুপ্তকে এক বিষপুরুষে। তবে বলে রাখা ভালো বিষপুরুষ চন্দ্রগুপ্ত আগেই হয়ে গিয়েছেন, এখন শুধু বিষের মাত্রা বাড়ানো হচ্ছে।ভয়ঙ্কর বিষধর এখন চন্দ্রগুপ্ত।সাধারণ বিষকন্যারাও এখন তার সংস্পর্শে এলে নিজেরাই মারা যাবে।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,সেই সময়ে সব রাজপুরুষ-কন্যা সবাইকেই বিষধর বানানো হত। তাদের নিজেদের সুরক্ষার জন্যই এরম করা হত। সেই অনুযায়ী দুর্ধরা নিজেও ছিলেন এক বিষকন্যা। তবে তিনি ছিলেন না চন্দ্রগুপ্তের মত এতটা বিষাক্ত।
ঠিক এরম এক সময়ে একদিন দুর্ধরা বসে রয়েছেন তার স্বামীর সাথে। দুর্ধরা তখন সন্তান সম্ভবা।হাসি খুনসুটি চলছে। এরম এক সময়ে হুট করে স্বামীর খাবার থেকে তুলে এক টুকরো মুখে তুলে নিলেন দুর্ধরা।সাথে সাথে জিভ জ্বলতে শুরু করে দিয়েছে।একরকম মাটিতে পড়ে ছটকাচ্ছেন দুর্ধরা।হতচকিত হয়ে গিয়েছেন চন্দ্রগুপ্ত।অস্তি ছিলেন আচার্য্যের সাথেই পাশের ঘরে ছিলেন তারা।রক্ষীর কাছে খবর পেয়েই আচার্য্য এলেন ঘটনাস্থলে।ব্যাপারটা শোনা মাত্র কোমর থেকে তরোয়াল বের করে এক কোপে কেটে নিলেন দুর্ধরার মাথা।তারপর পেট চিরে বের করলেন বিন্দুসারকে।এরপর প্রতিদিন একটি করে ছাগল কেটে তার পেটের মধ্যে বিশেষ ওষুধ দিয়ে বড় করা হতে থাকে বিন্দুসারকে। অবশেষে নয় মাস পার হলে পরে সুস্থ সবল বিন্দুসার জন্ম নেন।
মোটকথা সেদিন আচার্য্য বিষ্ণুগুপ্ত যদি এই কাজগুলো না করতেন বিন্দুসারকে আর পৃথিবীর মুখ দেখতে হত না।বিষ আরেকটু হলেই গলা বেয়ে চলে যেত পেটে
তখন তার মায়ের সাথেই তিনিও চলে যেতেন পরপারে।কিন্তু শত্রুর দল কি এতসব বলবে।বলবে এতটাই যতটুকু করলে কাজ হবে।রাগ অনেকেরই আচার্য্যের উপরে।কারন তিনি ছায়ার মত ঘিরে রাখেন চন্দ্রগুপ্তকে।একটুও এদিক ওদিক হতে দেন না। ফলে তাঁবেদার দলের বিশেষ সুবিধা হয় না।হটাতে চায় তারা আচার্য্যকে, আচার্য্য বোঝেন সব।
এদিকে আরেক স্ত্রী নন্দনীর সন্তান হচ্ছে না।একদিকে ঠিকই আছে। বিন্দুসারের এর বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়াবে না ভবিষ্যতে। কিন্তু যদি কোন কারনে বিন্দুসারের যদি কিছু হয় কে সামলাবে মৌর্য্য সাম্রাজ্য।তাই আরেকটি সন্তান হলে ভালো হয়...ভবিষ্যতে বিন্দুসার সম্ভবত চাণক্যর বিরুদ্ধেই যাবেন। ইঙ্গিত সেদিকেই। ভালোই বুঝছেন আচার্য্য কৌটিল্য। তাই দরকার আরেকজন।যে ধরতে পারবে শক্ত হাতে মৌর্য্য সাম্রাজ্যের ভিত্তি।দরকার শক্তিশালী ভিতের উপরে দাঁড়িয়ে এমন এক বংশের সন্তান।এ ক্ষেত্রে কেমন হবে হেলেনার ভবিষ্যৎ সন্তান...হবে তো মৌর্য্য বংশের রক্ত।ছোটর থেকে ঠিকমতো করে শিক্ষা দিলে নিশ্চয় সেও যোগ্য হয়ে উঠবে সেলুকাসের মত বীরের রক্ত, সাথে চন্দ্রগুপ্তের রক্ত একসাথে মিশবে। মহাবীর জন্মানোর সম্ভাবনা প্রবল
তবে নন্দনী কিন্তু যথেষ্ট শক্তিশালী রানী।যথেষ্ট তার প্রভাব রয়েছে। তিনি নিজে যোদ্ধা।তার নিজের রয়েছে বাহিনী।দুইহাজার হস্তী এবং চারহাজার রথের মিলিত বাহিনীর তিনি সেনাপতি।যখন ধননন্দর বাহিনীর সাথে যুদ্ধ হয় চন্দ্রগুপ্তের।তখন নন্দনী লড়াই করেছেন চন্দ্রগুপ্তের বিরুদ্ধে।কিন্তু পরাজিত হন ধননন্দ।সমঝোতা হিসেবে নন্দনীর সাথে বিবাহ হয় চন্দ্রগুপ্তের।নন্দ বংশের হয় পতন। মৌর্য্য বংশের হয় স্থাপনা।পুরো ব্যাপারটা পরিচালনা করেছিলেন আচার্য্য চাণক্য।এতে একরকম কূটনৈতিক জয় হয় আচার্য্যর।পুরো নন্দ সাম্রাজ্য আসে হাতে।নন্দনীর মত একজন শক্তিশালী যোদ্ধারানী হয়ে আসেন সবে মিলে এই সমঝোতা যেকোন জয়ের চেয়েই বেশী।তবে এই নন্দনীর এক সন্তান থাকলে সবচেয়ে ভালো হত তাহলে আর আচার্য্যর কোন চিন্তা আর থাকতো না।যাইহোক যা নেই তা নেই। যা আছে তার মধ্যেই ভাবতে হবে।আপাততভাবে সেলুকাসের কন্যার সাথে বিবাহটা মনে হচ্ছে সবদিক থেকে ঠিকঠাক হবে।নাহ এবারে এই প্রেমটার একটা পরিণতি দেওয়া দরকার।কিন্তু কিভাবে কি করা যাবে কোন সঠিক রাস্তা ভেবেই পাচ্ছেন না আচার্য্য
প্রায় চৌত্রিশ শেষের মুখে চন্দ্রগুপ্ত।এতদিন পরে আবার চন্দ্রগুপ্তের ইচ্ছে হয়েছে বিয়ে করার। তাও আবার যে সে নয় একদম প্রধান শত্রু সেলুকাসের কন্যাকে।কন্যার খুবই অল্প বয়স।খুবই অপরিণত সে মাত্র সতের বছর আর ওদিকে চন্দ্রগুপ্তের চৌত্রিশ শেষ হতে চলল।এরম অসম বয়সের প্রেম মেনেই বা নেবেন কেন হেলেনার পিতা সেলুকাস।বিরোধিতা হবেই।ফলাফলে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী।যুদ্ধটা সাধারণ হবেনা।এর ফলাফল কোনদিকে যেতে পারে বুঝে উঠতে মুশকিল হচ্ছে আচার্য্যের।এমনকি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে মৌর্য্য সাম্রাজ্য...
সময় যাচ্ছে চন্দ্রগুপ্ত হেলেনার প্রেম গড়াচ্ছে আর পাল্লা দিয়ে ঘুম উড়ে যাচ্ছে ।অবশেষে যা ভয় হচ্ছিল তাই হল জানতে পারলেন সেলুকাস।সরাসরি নাকচ করে দিলেন।পায়রা নিয়ে এল হেলেনার পত্র চন্দ্রগুপ্তের কাছে সেই পত্র অনুযায়ী চন্দ্রগুপ্ত আর দেরি নাকরে
পাঠালেন বিবাহ প্রস্তাব।সেটাও নাকচ হল।
হেলেনা অপূর্ব সুন্দরী।স্বাভাবিক ভাবেই তার পাণিপ্রার্থীর অভাব নেই সারা গ্রীস জুড়ে। বিভিন্ন রাজপুরুষের দল মুখিয়ে রয়েছে সেলুকাসের সুন্দরী কন্যার সাথে বিবাহ করার জন্য।এতে এক ঢিলে দুই পাখী শিকার হবে।সুন্দরী কন্যা সাথে সেলুকাসের মত শক্তিশালী রাজার সাথে সম্পর্ক স্থাপন।সেলুকাস খবর পাঠালেন বিভিন্ন জায়গায়।ভীড় জমে গেল বিবাহ প্রস্তাবের।অনেক রাজারা আগ বাড়িয়ে বলল- চন্দ্রগুপ্তের সাহস কি করে হয় গ্রীসের রাজকুমারীর সাথে প্রণয় করার অবিলম্বে তার রাজত্ব আক্রমন করে তাকে উচিত শিক্ষা দেওয়া উচিত হবে।সবাই মিলে সাহায্য করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিল।অবশেষে একরকম মান রক্ষার্থে যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিলেন সেলুকাস...সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে শুরু হল যুদ্ধ।সিন্ধুনদীর পাড়ে।কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে কয়েকদিনের মধ্যেই যুদ্ধে হার হল সেলুকাসের।
চন্দ্রগুপ্তের কাজ শেষ। এখন ময়দানে নামলেন আচার্য্য।পুরো বেপারটা তার নির্দেশে হতে লাগল পরিচালন-বন্দী সেলুকাসকে খুব সম্মানের সাথে রাখা হল।শুধু তিনি একটা মহলে বন্দী মাত্র।কেউ কোন খারাপ ব্যবহার করছে না।উপরন্তু সমস্ত সুবিধা অসুবিধা নজরে রাখছে সবাই।কেটে গেল বেশ কয়েকটি দিন।
অবশেষে কয়েকদিন পরে চাণক্য আর অস্তি এলেন তার সামনে। এসে তারা সেলুকাসকে নমস্কার করলেন।
সেলুকাস জানতেন নমস্কার এর অর্থ।প্রত্যুত্তর দিলেন তিনি নমস্কার করে।অস্তি কথাটা শুরু করলেন- মহারাজ আপনি তো আমাদের বন্ধু, আমাদের অতিথি। এই ভারতের বুকে সমস্ত বিদেশী হচ্ছে অতিথি। অতিথিদের ভগবান জ্ঞানে আপ্যায়ন করা হয় এই ভারতে।শুনে ইতস্তত বোধ করলেন সেলুকাস- কিন্তু যে বিদেশী আক্রমন করে সে কিকরে অতিথি হয়, সে হয় শত্রু।অস্তি বললেন- মহারাজ শত্রু তো কোনদিন ভাবি নি আপনাকে। আপনি আক্রমন না করলে জানতেও পারতাম না আপনি শত্রু বলে। যাইহোক আসুন আমরা ভুল বুঝাবুঝি শেষ করি। বন্ধুর মত কিছু কাজ করি...
এতক্ষন চুপচাপ দেখে চলেছিলেন আচার্য্য_বিষ্ণুগুপ্ত।
পড়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন একমনে সেলুকাসের মুখের প্রতিটি অভিব্যক্তি।অবশেষে বললেন তিনি - "মহারাজ আপনার বোধয় জানা নেই আপনার আসল শত্রু আপনার সাথেই রয়েছে। আপনি বন্দী হয়েছেন শুনে আপনার রাজ্যে তারা অশান্তি লাগিয়ে দিয়েছে। ভাগ করে নিয়েছে আপনার রাজ্য।যাইহোক চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য আপনার সেনাবাহিনী আর আমাদের সেনাবাহিনী যৌথভাবে এই সমস্যার সমাধান করেছি। আপাতত সবাই বন্দী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।এবার আপনি কি করতে চান ওই বন্দীদের নিয়ে, সেটা আপনার ব্যাপার। তবে এটুকু জানিয়ে রাখি- বন্ধু কিন্তু বন্ধুর উপকার করে এভাবেই...যাইহোক বিশ্রাম নিন।কাল আসব আবার কথা হবে।"
পরেরদিন এলেন তারা, সাথে আজ চন্দ্রগুপ্ত।
যে ঘটনা ঘটেছে তাতে সেলুকাস তাদের বন্ধুত্বের হাত ধরতে বাধ্য হবেনই। জানতেন চাণক্য।সেলুকাস এর সামনে রাখা হল বিবাহ প্রস্তাব।সেলুকাস বুঝেছিলেন বন্ধুত্বের পেছনের আসল উদ্দেশ্য।এই বিবাহ স্থাপন।কিন্তু অনেকদিন হয়েছে পার।হয়ত হেলেনার মন ঘুরে গিয়েছে।এমনিতেও তিনি চান না বিধর্মীর ঘরে নিজের কন্যা দিতে। হেলেনার বয়স কম বুঝতে পারছে না।নতুন জায়গা, নতুন ধর্ম, নতুন সংস্কৃতি, নতুন পরিবেশ নতুন ভাষা, নতুন লোকজনদের আপন করে নেওয়া এত সহজ নয়।তাই তিনি শুধু বললেন- আরেকবার মত নিতে হবে হেলেনার।
আলোচনা শেষ হল।বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে পাঁচশ রণহস্তী চন্দ্রগুপ্ত দিলেন উপঢৌকন সেলুকাসকে। সেলুকাস ছেড়ে দিলেন বর্তমান আফগানিস্তান পাকিস্তানের বেশ কিছুটা অংশ।পরেরদিন মুক্ত হয়ে গেলেন সেলুকাস।ফিরলেন নিজের রাজ্যে।গেলেন ব্যাবিলন। সেখানে রয়েছে তার কন্যা।কিন্তু সেখানে ঘটে গেল আরেক কান্ড।হেলেনাকে কি বোঝাবেন পিতা উল্টে হেলেনা বোঝালেন তার বাবাকে। এই বিয়ে কূটনৈতিক ভাবে কত সুবিধা এনে দিতে পারে...
সেলুকাস বোঝালেন তার মনের কথা। তার চিন্তার কথা। আদরের মেয়ে তার। কোন ইচ্ছে অপূর্ণ রাখেন নি।কেমন থাকবে সে বিদেশীর ঘরে।তাও সে হবে তৃতীয় রানী।যদিও প্রথম জন মারা গেছেন, রয়েছেন দ্বিতীয় রানী।তিনি কিভাবে নেবেন তার মেয়েকে...শঙ্কায় তার ঘুম হচ্ছে না।কিন্তু মেয়ের কথার ধরনে বুঝলেন মেয়েটি আর তার সেই ছোট্ট শিশু নেই। বড় হয়ে গিয়েছে।বরাবরের জেদী তার মেয়ে। যা ভাববে করেই ছাড়বে অনেক কথার পরে একরকম নিমরাজি হলেন সেলুকাস।বলতে গেলে মেয়ের জেদ দেখেই একরকম বাধ্য হয়েই রাজি হলেন বিয়েতে।
এদিকে মগধে শুরু হল আরেক ঝামেলা।মন্ত্রী সমেত বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং ব্রাহ্মনের দল কোনভাবেই মানতে রাজী হলেন না এই বিবাহ।তাদের অভিযোগ এই বিবাহ বর্ণসংকর রাজবংশের জন্ম দেবে। ফলাফলে নামবে সঙ্কট।সমস্ত অভিযোগ খন্ডন করলেন আচার্য্য। বললেন- যে বিবাহ রাজ্যের শিকড় মজবুত করে সেই বিবাহ কখনো সঙ্কট টেনে আনতে পারে না।এই বিবাহের ফলে সুদূর গ্রীস অব্দি বাণিজ্যের সুযোগ এনে দেবে।ফলাফলে সমৃদ্ধ হবে মৌর্য্য সাম্রাজ্য।সেলুকাসের মত শক্তিশালী রাজা থাকবে মিত্র হিসেবে। ফলাফলে ঘরে বাইরে শক্তিশালী হবে মৌর্য্য সাম্রাজ্য।আর পরবর্তী রাজা হচ্ছেন বিন্দুসার।অতএব বর্ণসংকর এর অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই...আচার্য্যের যুক্তি খন্ডন না করতে পেরে সবাই শান্ত হল।
অবশেষে ওদিক থেকেও এল স্বীকৃতি।চন্দ্রগুপ্ত এলেন বিশাল বরযাত্রী নিয়ে ব্যাবিলন।সেজে উঠল ব্যাবিলন। রাজকীয় সাজে।বিবাহ হল খুব জাঁক জমকের সাথে।
এদিকে সেজেছে মগধ।হবেনা কেন বিশাল সাম্রাজ্যের অধিশ্বরের বিয়ে বলে কথা। সারা মগধে বয়ে গেল আনন্দের হিল্লোল।জায়গায় জায়গায় বসানো হল বিনে পয়সার খাবারের শিবির।সবাইকে আকন্ঠ খাওয়ানো হল বেশ কয়েকদিন। বসানো হল নাচগানের আসর। শুধু রাজা নয় প্রজারাও পেলেন সমান আনন্দ। প্রতিটি ঘরের উপরে জ্বলল প্রদীপ।চলল গান বাজনার আসর।যেন এক দীপাবলী।
বিয়ের পর হেলেনা এলেন তার ভাইয়ের সাথে।
কদিন পরে এলেন তার বাবা মা।সাথে আনলেন অনেক উপঢৌকন। হাতি ঘোড়া সোনা সমেত বিভিন্ন দুর্মূল্য জিনিস।বেশ কয়েক সপ্তাহ তারা মগধের আদর আপ্যায়ন উপভোগ করে ফিরে গেলেন তাদের দেশে।
হেলেনা থাকতে শুরু করলেন চন্দ্রগুপ্তের সাথে।
খুব দ্রুত মানিয়ে নিলেন তিনি নন্দনীর সাথে।পুত্র বিন্দুসার এর সাথেও তিনি সহজ করে ফেললেন সম্পর্ক। বিন্দুসার তার চেয়ে মাত্র কয়েক বছরের ছোট।
বিম্বিসার এবং তার ভাই ছিলেন সমবয়সী।খুব ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল বিন্দুসারের সাথে হেলেনা এবং তার ভাইয়ের।হেলেনা শিখতে শুরু করলেন ভাষা। দ্রুত শিখে ফেললেন সংস্কৃত। শিখলেন নাচ গান।
কিছুদিনের মধ্যেই সেলুকাস পাঠালেন এক দূত'কে।
তিনি মেগাস্থিনিস।মূলতঃ মগধের খবরাখবর নিয়ে আসার জন্যেই প্রেরণ করলেন এই দূতকে। যদিও এই দূত কোন সাধারণ নয় তিনি হচ্ছেন এক পরিব্রাজক।পরিব্রাজক তথা সেই দূত এসে আতিথ্য গ্রহন করলেন চন্দ্রগুপ্তের প্রাসাদে মগধে।সেখানে তিনি খুব অবাক হলেন যখন তিনি দেখলেন গ্রীস এবং মগধের নিশানের চিহ্নে যিনি রয়েছেন তিনি একই দেবতা। এটুকু বুঝলেন কালভেদে স্থানভেদে দুই জায়গায় প্রভাব ফেলেছেন যে কালজয়ী পুরুষ তিনিই এদিকে বলরাম আর ওদিকে হেরাক্লিস তথা হারকিউলিস।
সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে গিয়ে তিনি সেলুকাসকে বললেন বিধর্মী নয় ভারতের সংস্কৃতি। বরঞ্চ শিকড় একই শুধু ডালপালা আলাদা। একই দেবতার পুজো করেন তারা তবে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে। আর সেই সূত্রে তার কন্যা হেলেনা খুব ভালো রয়েছেন মগধে। সম্পূর্ণভাবে তাদের মত হয়ে তাদের কন্যা রয়েছেন খুব ভালোই...শুনে আশ্বস্ত হলেন উৎকন্ঠিত পিতা সেলুকাস।
হেলেনা খুব দ্রুত প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন মৌর্য্য বংশে। অচিরেই তার এক সন্তানের জন্ম হয়।
হেলেনা তার নাম দেন জাস্টিন।মোটামুটি বছর কুড়ি তারা সংসার করেন একসাথে।তারপর যখন পঞ্চাশ বছর বয়স হয় তখন চন্দ্রগুপ্ত ধীরে ধীরে ঝুঁকতে শুরু করেন জৈন ধর্মের দিকে।অতঃপর চুয়ান্ন বছর বয়সে তিনি রাজকার্য পুত্র বিন্দুসারের হাতে সমর্পণ করে নিজে চলে যান শ্রবণবেলেগোলা।সেখানে তিনি কঠোর উপবাস শুরু করেন।চালিয়ে যান দুইটি বছর তার এই সাধনা।কঠোর উপবাসেই ছাপ্পান্ন বছর বয়সে প্রাণত্যাগ করেন। সময়টা 297 খ্রিস্টপূর্ব।
তখন হেলেনার বয়স মাত্র ত্রিশের আশেপাশে।
বেশ কিছু বছর হেলেনা থাকেন পুত্র জাস্টিনকে সাথে নিয়ে বিন্দুসারের রাজত্বে।এদিকে বিন্দুসারের সাথে দ্বন্দ্ব বাড়লে আচার্য্য ত্যাগ করেন মগধ। ততদিনে পুত্র জাস্টিন বড় হয়ে গিয়েছে তখন হেলেনা পুত্রের সাথে ত্যাগ করেন মগধ।ফিরে যান নিজের দেশ গ্রীসে। সেখানে তিনি তার শেষজীবন অতিবাহিত করেন।
----------
তথ্যসূত্রঃ-
১,মুদ্রারাক্ষস।
২,মোর্য- আবুল কাসেম।
৩,সোশ্যাল মিডিয়া।
৪,ইন্টারনেট।
৫,ছবি- গুগল সার্চ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন