প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গল্পে একটি বিধ্বংসী মোষের নাম দিয়েছিলেন কালাপাহাড়। কে জানে কেন এমন নামকরণ! মোষ সে কালো, সে ভেঙেচুরে ফেলে—তাতে কালো হতে পারে। কিন্তু কালা তো বধির—যে কানে শুনতে পায় না। তাহলে যার কানে ভালো কথা প্রবেশ করে না—সে-ই ‘কালা’। কখনও কখনও পাহাড় কালো রঙের হয়, বিশাল চেহারার কাউকে আমরা পাহাড়ের সঙ্গে তুলনাও করে থাকি। বিরাট আকারের কালো রঙের মহিষ—কালাপাহাড়? কিন্তু এই কথাটা মনে এলেই মনে পড়ে এটা একজন বিরাট চেহারার দস্যু— যে ধর্ম মানে না— ধর্মস্থান গুঁড়িয়ে ফেলে লুঠতরাজ চালায় আর বড্ড গোঁয়ার গোবিন্দ। পাষাণের মতোই তার কঠিন মন— কারও কথায় কান দেয় না।একজায়গায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন এমন লোকের কথা ভেবেই—‘পিতামহের কীর্তির প্রতি কালাপাহাড়ি করা।’ তাহলে বোঝাই যাচ্ছে যে,লোকটা মোটেই সুবিধের ছিল না— সব কিছু ভেঙেচুরে নষ্ট করে ফেলাতেই যার প্রবল আনন্দ।তবে এর পিছনেও নির্দিষ্ট কারণ ছিল,ছিল হিন্দুধর্মের গোঁড়ামি,রক্ষণশীলতা,অস্পৃশ্যতা।
তবে পরিচয়য়ের দিকে যাওয়া যাক এবার। কালাপাহাড়(১৫৩৪-১৫৮০) ছিলেন কররানী রাজবংশর এক দুর্ধর্ষ সেনাপতি। তার বাড়ি ছিল অধুনা বাংলাদেশের নওগাঁ (নিয়ামতপুর ) বীরজাওন গ্রামে। তিনি বিদ্বান ও বুদ্ধিমান ছিলেন। সুলায়মান খান কররানী যখন গৌড়ের শাসক সেসময় তিনি গৌড়ের সেনানীতে যোগদান করেন এবং অতি অল্পকালের মধ্যে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতার পরিচয় দিয়ে সুনজরে পতিত হন জৌনপুরের রাজা বহলোল লোদির ইনি ছিলেন ভাগ্নে।বাংলার সামাজিক ইতিহাস” -এর লেখক দুর্গাচরণ সান্যাল থেকে শুরু করে ঔপন্যাসিক রমাপদ চৌধুরী, পালা সম্রাট ব্রজেন্দ্র কুমার দে—সবার বক্তব্য একটাই: কালাপাহাড় ছিলেন হিন্দু ব্রাহ্মণ।
কথিত আছে, কোনও এক সময়ে দিল্লির সুলতান সেকন্দর লোদির বিরুদ্ধে বারবাক শাহ জোরতার যুদ্ধ লাগিয়ে বসেন। সেই যুদ্ধে বারবাকের দলে ছিল কালাপাহাড়। কিন্তু বারবাক যুদ্ধে হেরে গেলে কালাপাহাড়কে বন্দি করে বাদশাহের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।সেকন্দর দেখলেন কালাপাহাড় মাথা নীচু করে পায়ে হেঁটে তাঁর কাছে আসছে। অমনি গিয়ে তাঁর ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে সোজা কালাপাহাড়ের কাছে গিয়ে তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আর মুখে বললেন— ‘আপনি আমার বাবার মতো, আমাকেও আপনি আপনার ছেলের মতো ভাববেন।’মাথা উঁচু করে দু’চোখে বিস্ময় নিয়ে কালাপাহাড়ের মনে হল—এ কী শুনছে সে। তাই মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ করে বললে— ‘হুজুর জাঁহাপনা—গোস্তাকি মাফ করবেন। আমি আপনার গোলাম হলাম এখন থেকে, আপনার জন্যে আমি জান কবুল করতে রাজি। এই বলে তিনি বারবাক শাহকে পরিত্যাগ করে সেকন্দরের হয়ে বারবাকের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ শুরু করে দিলেন। অসমসাহসী কালাপাহাড়কে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে দেখে বারবাকের সৈন্যরা যে যেদিকে পারল— পালিয়ে বাঁচল। এই বিরোধিতা থেকেই তার পরিচয় হয়ে গেল কালাপাহাড়।’তবে এই ঘটনার সত্যতা খুব একটা গ্রহনযোগ্য নয়,সাল তারিখ নিয়ে প্রচুর অসঙ্গতি আছে।
তার আসল নাম রাজীবলোচন রায় মতান্তরে কালাচাঁদ রায় (বা রায় ভাদুড়ী বা রাজচন্দ্র বা রাজকৃষ্ণ বা রাজনারায়ণ,ডাকনাম রাজু। তিনি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান ছিলেন,পিতার নাম ছিল নয়ানচাঁদ রায় (ইনি গৌড় বাদশাহের ফৌজদার ছিলেন)। নিয়মিত বিষ্ণু পূজা করতেন। নবাব সুলায়মান খান কররানীর কন্যা দুলারি বিবি তার প্রণয়ে পড়লে ইসলাম ধর্ম অনুসারে সুলায়মানের কন্যার পাণিগ্রহণ করেন এবং সুলায়মানের প্রধান সেনাপতির পদ অলংকৃত করেন,মুসলমান কন্যা বিবাহের সুবাদে বর্ণবাদী হিন্দু সমাজ তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। আর সেই কারণে প্রতিশোধস্পৃহায় অন্ধ হয়ে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে 'মহম্মদ ফর্ম্মুলি' নাম ধারণ করেন।আর তখন থেকেই কালাপাহাড় নামে পরিচিত হন। ১৫৬৮ সালে তিনি পুরীর শ্রী শ্রী জগন্ননাথ ধাম আক্রমণ করেন এবং মন্দির ও বিগ্রহের প্রচুর ক্ষতিসাধন করেন।
১৫৬৪-৬৫ খ্রিষ্টাব্দে আকবর বাদশাহের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করে উড়িষ্যার রাজা হরিচন্দন মুকুন্দদেব গৌড় আক্রমণ করে গঙ্গার তীরে অবস্থিত সপ্তগ্রাম বন্দর অধিকার করে নেন। পরে আকবর যখন মেবারের শিশোদীয় রাজাদের সঙ্গে দীর্ঘকাল যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন, সেই অবসরে সুলায়মান খান কররানী উড়িষ্যা আক্রমণ করেন। মুকুন্দদেব কোটসামা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করলে সুলায়মান কালাপাহাড়ের অধীনে ময়ূরভঞ্জের অরণ্যসংকুল পথে উড়িষ্যা আক্রমণ করতে সৈন্য পাঠান।
এইসময় মুকুন্দদেব তারই এক বিদ্রোহী সামন্তের হাতে নিহত হন; এর ফলে ওই বিদ্রোহী সামন্ত এবং রঘুভঞ্জ ছোটরায় উড়িষ্যার সিংহাসন দখল করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু উভয়েই কালাপাহাড় কর্তৃক পরাজিত ও নিহত হয়েছিলেন।কোচরাজ নরনারায়ণ, সুলায়মান খান কররানীর রাজত্বকালে গৌড়রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন কিন্তু কালাপাহাড় একাধারে রাজা নরনারায়ণের ভাই এবং সেনাপতি শুক্লধ্বজকে পরাজিত করে আসামের তেজপুর পর্যন্ত অধিকার করে নিয়েছিলেন। এইসময়ে কামাখ্যা ও হাজোর প্রাচীন মন্দিরগুলিতে কালাপাহাড় নির্বিচারে ধ্বংসকাণ্ড চালিয়েছিলেন।মোগল সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে কালাপাহাড় আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন। বঙ্গদেশ ও বিহারে আকবরের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ হয় কালাপাহাড় তাতে যোগদান করেন এবং অনুমান করা হয় তিনি এই যুদ্ধে নিহত হন (এপ্রিল ১৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দ) ।
মুসলিম কন্যা বিবাহের কারণে কালাপাহাড় সমাজচ্যুত হন। মায়ের অনুরোধে কিছুদিন পর তিনি বাংলার হিন্দু ধর্মগুরুদের কাছে প্রায়শ্চিত্তের বিধান চাইলে তারা কোন বিধান দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে তিনি পুরীর জগন্নাথ দেবের মন্দিরে গিয়ে প্রায়শ্চিত্তের সংকল্প করেন। কিন্তু পুরীর ধর্মগুরুরা তাকে ও তার স্ত্রীকে মন্দিরে প্রবেশ করতে বাধা দেন এবং তার কোন প্রায়শ্চিত্ত হবে না বলে জানিয়ে দেন। এতে কালাপাহাড় মর্মাহত হন এবং প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাই উড়িষ্যা অভিযানকালে তিনি উড়িষ্যার ধর্মগুরু ও ধর্মস্থানের উপর প্রতিশোধ নেবার সুযোগ পান। ১৫৬৭-৬৮ খ্রীষ্টাব্দে মুকুন্দ দেবের বিরুদ্ধে সুলাইমান কররাণীর পুত্র বায়েজিদ খান কররাণী ও সেনাপতি সিকান্দার উজবেকের যুদ্ধে মুকুন্দ দেবের পতন হলে কালাপাহাড় উড়িষ্যা ও তার নিকবর্তী অঞ্চলের হিন্দু মন্দিরগুলোতে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালান। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর করেন এবং মন্দিরের সম্পদ লুণ্ঠন করেন। জানা যায়, কালাপাহাড় জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার কাঠের প্রতিমা উপড়ে নিয়ে হুগলী নদীর তীরে আগুনে পুড়িয়ে দেন।
কালাপাহাড় উড়িষ্যার বালেশ্বরের গোপীনাথ মন্দির, ভুবনেশ্বরের কাছে কোনার্ক মন্দির, মেদিনীপুর, ময়ুরভঞ্জ, কটক ও পুরীর আরো কিছু মন্দিরে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালান। কালাপাহাড়ের মন্দির আক্রমণের প্রক্রিয়াটি একটু অভিনব ছিল। তিনি গরুর চামড়ার বিশাল আকৃতির ঢোল আর পিতলের বড় বড় ঘণ্টা মন্দিরের ভেতরে ক্রমাগত বাজিয়ে তীব্র অনুরণন তৈরি করার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই অনুরণনের তীব্রতায় প্রতিমাদের হাতগুলো খসে পড়ত। এতে উপস্থিত লোকজন হতভম্ব হয়ে পড়লে প্রতিমা উপড়ে ফেলা হত। কালাপাহাড় মন্দির সমূলে ধ্বংস করার চেয়ে প্রতিমা ধ্বংস ও লুটপাটে বেশি আগ্রহী ছিলেন।
মন্দির আক্রমণের শেষ পর্যায়ে কালাপাহাড় সম্বলপুরের মা সম্বলেশ্বরীর মন্দিরে আক্রমণ করতে সম্বলপুরের উপকণ্ঠে মহানদীর তীরে দুর্গাপালীতে উপস্থিত হন। একজন নারী গোয়ালিনীর ছদ্মবেশে কালাপাহাড়ের ছাউনিতে উপস্থিত হন। তিনি সৈন্যদের মধ্যে বিষ মিশ্রিত দুধ, দই, ছানা, বিক্রি করেন। পরদিন সকালে খাদ্যের বিষক্রিয়ায় কালাপাহাড়ের বেশির ভাগ সৈন্য আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তিনি অবশিষ্ট সৈন্যদের নিয়ে পালিয়ে যান,মনে করা হয় দেবী সম্বলেস্বরী গোয়ালিনি ছদ্মবেশ নিয়ে এসেছিলেন।মন্দির ধ্বংসের ঘটনা উড়িষ্যা ও মেদিনীপুরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কররাণীদের কোচবিহার আক্রমণকালে কালাপাহাড় আসামের কামাখ্যা মন্দিরসহ আরো কিছু মন্দির ধ্বংস করেন।
কালাপাহাড় কররাণীদের শেষ শাসক দাউদ খান কররাণীর আমল পর্যন্ত কররাণীদের সেনাপতি ছিলেন এবং মুঘলদের বিরুদ্ধে অভিযানগুলোতে অংশগ্রহণ করেন। ১৫৭৬ খ্রীষ্টাব্দে কররাণীদের পতনের পর কালাপাহাড় সম্ভবত আফগান নেতা মাসুম কাবুলীর দলে যোগ দেন এবং মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত থাকেন। সম্ভবত ১৫৮০-’৮৩ খ্রীষ্টাব্দে মুঘল সেনাপতি খান ই আজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মাসুম কাবুলী পরাস্ত হলে সেই যুদ্ধে কালাপাহাড়ও নিহত হন।
আকবরনামার মতে, সে যখন মোগল সেনাপতি মুনিম খাঁ দাউদকে ধরবার জন্যে কটকে হাজির হয় তার অল্পকাল পরেই কালীগঙ্গার তীরে মোগলবাহিনীর তোপে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়।মারা যাবার সময় তার হেফাজতে তিনশো মন পাকা সোনা, গয়না ইত্যাদি পাওয়া যায়। তাঁর একটি মাত্র কন্যা ছিল—ফতমালিকা। সে-ই বাবার বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হয়।
মুঘলদের সঙ্গে যুদ্ধে কালাপাহাড়ের মৃত্যুর পর তাকে উড়িষ্যার সম্বলপুরে মহানদীর তীরে সমাধিস্থ করা হয়। সম্বলেশ্বর কলেজ বিল্ডিং-এর গায়ে অসংখ্য সমাধি দেখে অনুমান করা হয় এগুলি কালাপাহাড়ের সহযোদ্ধাদের; তাই একদল উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আক্রোশে ২০০৬ সালে তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
-------------
Pore khub valo laglo dada. ❤️❣️
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ❤️ভালো থেকো।
মুছুন