★জামাইষষ্ঠি ও জলভরা সন্দেশের উৎপত্তি ও ইতিহাসঃ-
খাদ্যরসিক বাঙালীর কাছে "জ"শব্দটি খুবই জনপ্রীয় এবং আমোদপ্রীয় অক্ষরও বটে।এখন আপনারা বলবেন যে এত্ত ভালো ভালো অক্ষর থাকতে শেষে কিনা "জ"।কই,আমরাও তো বাঙালী "জ" কে তো এত্ত পাত্তা দিই না।আরে মশাই আপনিও দেন,,,বলছি তো দেন।নাহলে "জামাষষ্ঠী" কবে আসবে,আর শ্বাশুড়ি মার হাতে কত্ত কি লিচু,আম,কলা,মাংস-টাংস খাবেন তার জন্য দিন গোনেন কেন?আর সেই "জামাইষষ্ঠীর" মিষ্টির পাতে "জলভরা"থাকবে না এটা কখনো কি সম্ভব? যাইহোক এতক্ষনে মনে হয় আপনারা প্রত্যেকেই "জ" এর মাহাত্ম্য বুঝে গিয়েছেন।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এখানে আমি "জ"এর উৎপত্তি দেখাতে আসিনি,এই যে "জ" দিয়ে দু-দুটো শব্দ পেলাম,তারই ইতিবৃত্ত আপনাদের সাথে শেয়ার করতে এসেছি।তবে এবার আসা যাক আসল কথায়।
বাঙালীর ঘরে ঘরে বৌভাতের মতোই জামাইষ্ঠী হল একটি সম্পর্কের সম্মানার্থে পালনীয় উৎসব।প্রথমটি নববধূর আগমনে অনুষ্ঠিত হয়,দ্বিতীয়টি অনুষ্ঠিত হয় জামাতার আগমনে।কিন্তু আপনি কি জানেন, জামাই ষষ্ঠী আসলে জামাইদের উৎসবই নয়? অবাক হচ্ছেন? অবাক হওয়ারই কথা! তাহলে একটু শাস্ত্র ঝালাই করে দেখে নিতে পারেন ।সেখানে আপনি দেখতে পাবেন, জামাই ষষ্ঠী আসলে সন্তান প্রাপ্তির আশায় "মা বিন্ধ্যবাসিনী স্কন্দ ষষ্ঠী"র কাছে সকল মায়েদের প্রার্থনা। এই সন্তান প্রাপ্তির জন্য মা তাঁদের মেয়েদেরও ডেকে নেন। আর স্বামীরা আসেন মেয়েদের সঙ্গে। অর্থাৎ, "স্কন্দ ষষ্ঠীপুজো" র অনুষ্ঠানে বাবা-মা মেয়েকে আমন্ত্রণ জানান যাতে সেও মা ষষ্ঠীর কাছে সন্তান লাভের প্রার্থনা জানাতে পারেন।
★মা বিন্ধ্যবাসীনি ষষ্ঠী
এইবার ইতিহাসে আসা যাক। ভারতবর্ষ তথা বাংলার রক্ষণশীল সমাজব্যাবস্থায় বেশিরভাগ মেয়েই ছিল অন্তঃপুরবাসিনী। একা একা কোনো মেয়েই বাপেরবাড়ি যেতে পারত না সমাজের বিধি বিধি-নিষেধকে অগ্রাহ্য করে। অন্তত শ্বশুরবাড়ি থেকে একা পাঠানো হত না। মেয়ের সঙ্গে যেত জামাই। বাবা-মায়ের আদরের মেয়ের স্বামী, যার হাতে কিনা সারা জীবনের ভালো-মন্দের ভার তুলে দেওয়া হয়েছে তাদের আদরের মেয়ের। সেই জামাইকে তো তৃপ্ত করতেই হবে।
এইভাবে মেয়েদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল এবং স্বামী-সংসার নিয়ে যাতে মেয়ের কোনো অসুবিধা না হয়।মেয়ে যাতে তাঁর স্বামীর চোখের নয়নের মণি হয়ে থাকতে পারে।তাইজন্য শুরু হল এই মা ষষ্ঠীপূজোর দিন জামাইদের পাত পেড়ে খাওয়ানোর উৎসব। জামাই ষষ্ঠী মানেই তাই হিন্দু-বাঙালি জামাইরা কব্জি ডুবিয়ে খাবেন। শাশুড়ি পাখা করে বাতাস করবেন।ফলাহারে আম,লিচু,কলা,তালশাঁস, দুপুরে পাঁঠার মাংস,ভাত,এটা ওটা সেটা সহ পদে কী না থাকবে না! তবে মিষ্টি হিসাবে অবশ্যই "জলভরা "তো থাকবেই। এইভাবে হিন্দু-বাঙালির ঘরে ঘরে পরম-যত্নে "পূজিত"হতে থাকলেন আদুরে জামাইরা। যদিও চলতি বছরে করোনার আতঙ্কে এবং লকডাউনের বাজারে অসংখ্য জামাইদের মন ভেঙে চূরমার হয়ে গিয়েছে,তবে চিন্তা নেই আসছে বছর আবার হবে,এই আশা বুকে বেঁধে আবার আগামী বছরের জামাইষষ্ঠীর জন্য প্রস্তুতি নিন।
★জামাইষষ্ঠীর মধ্যহ্নভোজনের পদ
★বাঙালীর দ্বিতীয় " জ" অর্থাৎ জলভরাঃ-
এবার আসা যাক বাঙালীর দ্বিতীয় "জ" এর ইতিহাসের সন্ধানে।তবে মনে হয় কারো মনে প্রশ্ন নেই এই "জ" এর মানে কি।আজ্ঞে হ্যাঁ,এই "জ" হল "জলভরা"।
আর জলভরা সন্দেশ বলতে একটাই নাম, সূর্য মোদক, যে মিষ্টান্ন-কারিগরের হাতে এই রহস্যময় " জলভরা" সন্দেশের সৃষ্টি ও জনপ্রিয়তার শুরু। তবে জলভরার সঙ্গে আজকের চন্দননগর-ভদ্রেশ্বর এর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেলেও সূর্য কুমার মোদক ও তাঁর পরিবার কিন্তু এখানকার আদি বাসিন্দা নন। এঁরা ছিলেন মূলত দক্ষিণ ২৪ পরগণার সুকচর অঞ্চলের বাসিন্দা। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নিজের পরিবার নিয়ে সুকচর থেকে গঙ্গা পেরিয়ে ফরাসডাঙ্গার পাশে "বারাসাত" (বর্তমান উত্তর ২৪ পরগণার বারাসাত নয়, ভদ্রেশ্বরের বারাসাত) অঞ্চলে চলে আসেন। সূর্য কুমার তখন সবে মাত্র বালক। তখনও তাঁদের মিষ্টির দোকান হয়নি। আর আজকের মত এত রকম মিষ্টিরও সেকালে এত চল ছিল না। নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাঙালির পুজো-পার্বণ বা উৎসব-অনুষ্ঠানে মণ্ডা, মেঠাই, বরফি, মোরব্বা ইত্যাদি সাধারণ কিছু মিষ্টান্নই প্রচলিত ছিল।
সূর্য কুমারের পিতা মাধব চন্দ্র মোদক এরকমই একটা সময়ে ফরাসডাঙ্গায় এসে দোলো নামক এক প্রকার গুড়ের ব্যবসা শুরু করেন। দোলো হল আখের রস থেকে দেশীয় পদ্ধতিতে চিনি তৈরি করার মধ্যবর্তী একটি স্তরে উৎপন্ন অপরিশুদ্ধ দানাযুক্ত গুড়, যা জ্বাল দিতে দিতে পরবর্তী পর্যায়ে গিয়ে চিনি তৈরি হয়। চুঁচুড়া চন্দননগর অঞ্চলে সে যুগে দেশীয় পদ্ধতিতে গুড় ও চিনি তৈরির ব্যবসা বেশ জনপ্রিয় ছিল। মাধবচন্দ্র চন্দননগর আসার অন্তত সত্তর-আশি বছর আগে ডাচ নৌবিশারদ জন স্প্লিন্টার স্ট্যাভরিনাস চুঁচুড়ায় এসেছিলেন এবং তাঁর দিনলিপিতে চুঁচুড়ার এরকমই একটি গুড় তৈরির কারখানার বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে বারাসাতের মাধবচন্দ্র মোদক এই দোলো গুড় থেকেই পরবর্তীকালে টুকটাক মিষ্টান্ন তৈরি করে বিক্রি করতে শুরু করেন। কালক্রমে তিনি মিষ্টান্ন ব্যবসায়ে উন্নতি করেন এবং বারাসাত অঞ্চলেই একটি মিষ্টির দোকান চালু করেন। কিশোর সূর্য কুমার এই সময়েই বাবার কাছে পৈতৃক ব্যবসায় হাতেখড়ি লাভ করেন এবং মিষ্টান্ন তৈরির কারিগরি শিক্ষার হাতেকলমে পাঠ লাভ করেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পূর্বেই বলা হয়েছে,সেকালে মূলত কদমা, মঠ, মন্ডা প্রভৃতি মিষ্টান্ন প্রচলিত ছিল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মিষ্টির দোকানে ছাঁচের ব্যবহার শুরু হবার পর বিভিন্ন ডিজাইনের সন্দেশের প্রচলন হয়। জলভরা তালশাঁসের সন্দেশ আসে তার কিছু পর। সূর্য কুমার মোদক কেবল একজন মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীই ছিলেন না, তাঁর ভিতরে শিল্পবোধের সহজাত প্রতিভা ছিল। যে জন্য শুধু নয়, তাঁর হাতের আঁকাও নাকি ছিল চমৎকার। মাটি ও কাঠের ছাঁচও তিনি নিজে হাতেই বানাতেন বলে শোনা যায়। ওনার প্রপৌত্র শুভেন্দু মোদকের মুখে শোনা যায়, সন্দেশের উপকরণ তৈরীতে কোনদিন তাঁকে দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। হাতের আন্দাজে চিনি ও ছানার মিশ্রণে অদ্ভুত সুস্বাদু সব সন্দেশ তৈরী করতেন তিনি। ক্ষীরপুলি, মতিচুর ইত্যাদি সন্দেশ তিনিই প্রথম তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে তাঁর শ্রেষ্ঠতম এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় আবিষ্কার নিঃসন্দেহে আজকের "জলভরা" সন্দেশের।
এবার আসা যাক সূর্য মোদকের জলভরা সন্দেশের উৎপত্তির ইতিহাসে। তখন সালটা সম্ভবত ১৮১৮। বাংলায় তখন ইংরেজ শাসন চালু হলেও আনাচেকানাচে দু-চারটে জমিদারি তখনও টিকে আছে বহাল তবিয়তে। আয় যেমনই হোক, আদবকায়দায়, ঠাটেবাটে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা পুরোপুরি বর্তমান। এমনই এক জমিদার ছিলেন ভদ্রেশ্বরের তেলিনীপাড়ার বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার। বাড়ির মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পরে মেয়ে এসেছে বাপের বাড়ি জামাই নিয়ে জামাইষষ্ঠী উপলক্ষে। তখন আবার জামাইঠকানো বা বউঠকানো বহু প্রথা চালু ছিল। এখন সেগুলো বোকা বোকা মনে হলেও তখন এইসব প্রথা রমরমিয়ে চলত। সে যাই হোক, জামাইকে ঠকাতে হবে। কী করা যায়? ঠকানোও হল আবার জামাই বাবাজীবন রাগও করতে পারলেন না, এমন কিছু ব্যবস্থা করতে হবে।
অনেক ভেবে তেলিনীপাড়ার জমিদারবাড়িতে তলব হল এলাকার নামকরা ময়রা সূর্যকুমার মোদকের। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হল এমন একটা মিষ্টি বানাতে হবে যা দিয়ে জামাই ঠকানো যাবে অথচ তাঁর মানসম্মান যেন কোনওভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়। বহু ভাবনাচিন্তা করার পর মোদক মহাশয় একটা বিশাল আকারের মিষ্টি বানালেন, যার ভেতরে জল ভরা থাকে, অথচ বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায়ই নেই। সেই মিষ্টি দেওয়া হল জামাইয়ের পাতে। মিষ্টিতে মাতোয়ারা জামাই সেই মিষ্টি হাতে নিয়ে দিলেন বিশাল এক কামড়। আর যেই না কামড়ানো, মিষ্টির ভেতরের লুকোনো জল বেরিয়ে এসে ভিজিয়ে দিল জামাইয়ের সাধের গরদের পাঞ্জাবি। জামাই অপ্রস্তুত। হো হো করে হেসে উঠলেন শালা-শালিদের দল। ঘোমটার আড়ালে হাসিতে ভরে উঠল শাশুড়িদের মুখ আর জমিদারবাবু গোঁফে দিলেন তা। জন্ম হল "জলভরার"।তবে গল্পটি সত্য হোক বা না হোক, এই মিষ্টি তৈরির আইডিয়া এবং কারিগরি কৌশলের কথা ভাবলে অবাক হতে হয়।
শ্রী সূর্য মোদক
সূ্র্য মোদকের জলভরার বিশেষত্ব হল এ মিষ্টি তৈরি হয় ক্রিমযুক্ত গরুর দুধের খাঁটি ছানা থেকে। গরুর দুধ দোয়ানো মাত্র সেই দুধ মাটির কড়ায় জ্বাল দিতে বসানো হয় এবং একটি খেজুর গাছের কাঠি বা তাড়ু দিয়ে অনবরত নাড়া হতে থাকে যাতে তলায় ধরে না যায়। কোনরকম ধাতব পাত্র বা হাতা ব্যবহার করা হয়না। এই পদ্ধতি চলতে থাকে ঘন্টা খানেক ধরে, ঘুঁটের জ্বালে খুব কম আঁচে। একই ভাবে একটি খেজুর গাছের ডালের অগ্রভাগে নারকেলের মালা লাগিয়ে হাতা বানানো হয়। সেই নারকেলের মালাতে করে দেওয়া হয় ছানার বীজ জল। এই বীজজলই (তেঁতুল বা লেবুর জলের মিশ্রণ) দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরী করে। জলভরার ছানা হতে হবে মোলায়েম, ক্ষীরের মত। হুগলীর নস্করপুরের গ্রামের ঘোষালরা এই বিশেষ ছানা তৈরীতে মুন্সীয়ানা দেখিয়ে আসছেন বংশ পরম্পরায়। গ্রামে ২০-২২টি গোয়ালা পরিবার তিন প্রজন্ম ধরে সূর্য মোদকের দোকানে ছানা সরবরাহ করে আসছেন। গোটা গ্রাম মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ৬০-৭০ কেজির ছানা তৈরি হয়। পুরো ছানাটাই চলে আসত সূর্য মোদকের মূল কারখানায়। কারখানায় নিয়মিত ছানা সরবরাহ করত সেই গ্রামেরই গোয়ালা কানাই ঘোষ।
তারপর সেই ছানা চলে আসে সূর্য মোদকের ভিয়েন ঘরে। দাঁড়িপাল্লাতে ছানার ওজন করা হয় এবং সেই ছানাকে বাটা হয়। আগেকার দিনে শিল নোড়ায় বাটা হত, বর্তমানে মেশিনের সাহায্য নেওয়া হয়। আগে থেকে প্রস্তুত করে রাখা থাকে চিনির রস বা গুড়। মরসুমের ভিত্তিতে চিনির রসের পরিমাণে রকমফের হয়। শীত কালে মিষ্টির পরিমাণ কমিয়ে আনা হয়। গরমকালে ঠিক বিপরীত। এরপর পরিমাপ মত ছানা বাটা ও চিনির রস মিশিয়ে জ্বাল দিতে বসান হয়। ফুটতে শুরু করলে তাড়ু দিয়ে ক্রমাগত নাড়তে হয়। এইভাবে নাড়তে নাড়তে যখন মিশ্রণটি ঘন হয়ে আসবে, তখন উনুন থেকে নামিয়ে নিয়ে ঘন ঘন তাড়ু দিয়ে নাড়তে হয়। বেশ কিছুক্ষণ নাড়ার পরে পাক আঁটোসাঁট হয়ে আসবে। ব্যাস, মাখা সন্দেশ তৈরি!
এরপর সন্দেশ মিশ্রণটি কাঠের বারকোশে নিয়ে ময়রার অভিজ্ঞ হাতের জাদুতে দলে দলে মিহি করে ফেলা হয়। এর পর সন্দেশের ছোট ছোট লেচি কেটে কাঠের ছাঁচে ভরা হয়। এরপর একটি গোলাকার কাঠের রুলের সাহায্যে তালশাঁসটির দৈর্ঘ্য বরাবর একটি ১ ইঞ্চি ব্যাসের ফুটো করে তাতে গোলাপ জলের সিক্রেট মিশ্রণ ঢালা হয়। শোনা যায় আগে এই জল আসত কনৌজ থেকে। জল ঢালা হলে গর্তটি সন্দেশের পুরু প্রলেপ দিয়ে বুজিয়ে ফেলা হয়। আপাতদৃষ্টিতে এই ছাঁচে ফেলার কাজটি সহজ মনে হলেও আদতে তা একদমই নয়।
★চন্দননগরের দাঁড়িয়ে
থাকা জলভরা
আজকের জলভরা সন্দেশের ক্ষেত্রে চন্দননগর এক গুরুত্বপূর্ন স্থানের অধিকারী। চন্দননগরের জলভরার সঙ্গে বাকি জায়গার জলভরার প্রধান পার্থক্য হল চন্দননগরের জলভরা দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে ছানার মিশ্রণটির গুণগত বৈশিষ্ট্যের উপর এটি বিশেষভাবে নির্ভর করে। সন্দেশের আকার যত বড়ই হোক সেটিকে তার বেসের উপর দাঁড় করানোটাই মূল চ্যালেঞ্জ। অন্যান্য অনেক দোকানেই জলভরা সন্দেশ শুইয়ে রেখে পরিবেশন করা হয়। উপরন্তু অনেক সময়েই দেখা যায় জলভরার যে মূল বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ সন্দেশে কামড় দেওয়ার সাথে সাথেই ভিতরের গোলাপ জল নরম সন্দেশের বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসবে, এই ব্যাপারটি কার্যক্ষেত্রে অনেকে সফলভাবে করে উঠতে সক্ষম হন না। বহু ক্ষেত্রে সন্দেশের ভিতরের জল সন্দেশের সঙ্গে মিশে যায়। জলভরা হয়ে যায় জলছাড়া! কিন্তু চন্দননগরের সূর্য মোদকের জলভরার ক্ষেত্রে এই সমস্যাগুলি কখনই দেখতে পাবেন না। কারণ দেড়শ বছরের সিক্রেট রেসিপিকে আজও সূর্য কুমার মোদকের বংশধররা ধরে রেখেছেন এবং প্রত্যেকদিন সজাগ দৃষ্টি রেখে চলেছেন নিজেদের মিষ্টির ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোলে’ যাতে কোনও খামতি না হয়। ফলাফল সকলেরই জানা।
জলভরা
আজকের দিনে জলভরা সন্দেশের গুণগ্রাহী নয় এমন মানুষ পাওয়া যাবে বলে তো মনে হয়না। সাধারণ মানুষ থেকে বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব- সকলেই এই মিষ্টিতে মজেছেন যুগ যুগ ধরে।শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি সূর্য মোদকের মতিচূর ও জলভরা সন্দেশ খেয়ে তারিফ করেছিলেন। সত্যজিৎ রায় নাকি চন্দননগরের ওপর দিয়ে কোথাও গেলেই এই দোকানে দাঁড়িয়ে মিষ্টি কিনে নিয়ে যেতেন। এরকমই নাকি একবার বোলপুরে শুটিং-এ যাওয়ার পথে সূর্য মোদকের দোকানে সন্দেশ খেয়ে তিনি অগ্রিম ১০ টাকা জমা রেখে যান ফেরার পথে সন্দেশ নিয়ে যাবেন বলে। কিন্তু ফেরার পথে অন্য রাস্তা দিয়ে ফেরার কারণে আর মিষ্টি নিয়ে যাওয়া হয়নি। এই দোকানের বর্তমান কর্তা শুভেন্দু মোদক জানিয়েছেন যে,সেই দশটাকা আজও জমা রাখা আছে সত্যজিৎ রায়ের নামে। এছাড়া শোনা যায়,পূর্বতন রেলমন্ত্রী ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর জন্য একাধিকবার অর্ডার দিয়ে জলভরা সন্দেশ নিয়ে গেছেন।
★চন্দননগরের সূর্য মোদকের
বর্তমান দোকান।
সূর্য কুমার মোদক এর মিষ্টান্ন দোকানের বর্তমান মালিক সূর্য কুমার মোদকের প্রপৌত্র শ্রী শুভেন্দু মোদক।
★তথ্যসূত্রঃ-
1, "Voyages to the East-Indies; By the Late John Splinter Stavorinus, Esq. Rear-Admiral in the Service of the States-General "– John Splinter Stavorinus.
2, "মিষ্টান্ন-পাক "– শ্রী বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় প্রণীত।
3, "হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ"-সুধীর কুমার মিত্র।
4,এছাড়া "আনন্দবাজার", "বর্তমান" এর পুরনো সংস্করন (INTERNET ARCHIVE থেকে)।
5,সমস্ত ছবি ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত।।
-------------------------------
★★★উপরিউক্ত প্রবন্ধটি কোনো গবেষণাপত্র বা এরূপধর্মী কোনো কাজ নয়।কতকগুলি সংগৃহিত [বিভিন্ন বই,ইন্টারনেট,উইকিপিডিয়া,Article,বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম থেকে নেওয়া তথ্য] তথ্যের ছাত্রপাঠ্য এবং সুখপাঠ্য বিশ্লেষণ মাত্র।এরূপ ইতিহাসের আরও ছোটো বড়ো গল্প, প্রবন্ধ,আলোচনা পড়ার জন্য আমার ব্লগটি ফলো করুন সকলে। যথাযথভাবে আরও লেখা পরিবেশনের চেষ্টা করব।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন