সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইনকা সভ্যতা'র ইতিবৃত্ত।


পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলির মধ্যে গ্রীক ও রোমান সভ্যতা,ভারতের সিন্ধু সভ্যতা,মিশরীয় সভ্যতা,ব্যাবিলনীয় সভ্যতা,এবং মেসোপটেমিয়া সভ্যতা সবিশেষ উল্লেখ্যযোগ্য।এতটা সুপ্রাচীন না হলেও এরকমই একটি উন্নত এবং রহস্যময়ী সভ্যতা ছিল দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম অংশে আন্দিজ পর্বতমালার বুকে গড়ে ওঠা ইনকা সভ্যতা (১৪৩৮-১৫৩৩খ্রীঃ)।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মিশরের পিরামিডের নির্মাণশৈলী যেমন আধুনিক মানুষকে বিস্মিত করে, ঠিক তেমনি ইনকা সভ্যতার স্থাপত্যশৈলীও অবিশ্বাস্য স্থাপত্যের পরিচয় বহন করে! আমরা সকলেই জানি যে,অন্যান্য সভ্যতা আরেক সভ্যতার সংস্পর্শে এসে নতুন কিছু শিখেছিলো।যেমন হরপ্পার সাথে মেসোপটেমিয়া,সুমের সভ্যতার আদানপ্রদান ছিল।কিন্তু অন্য সব সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন এই ইনকা সভ্যতা যা করেছিল নিজে নিজেই করেছিল বলে মনে করা হয়।স্থাপত্যবিদ্যা থেকে শুরু করে জ্যোতির্বিজ্ঞন,স্বাস্থ্যবিজ্ঞানেও রয়েছে এঁদের অবদান। আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে কি করে তারা এত উন্নত সভ্যতা গড়ে তুলেছিল! কিভাবে নির্মাণ করেছিল আশ্চর্য স্থাপত্য ‘মাচু পিচু’ নগরী! একমাত্র আকাশপথ ছাড়া কোনোভাবেই আক্রমণ করা সম্ভব ছিলো না যে নগরী।কিন্তু কালের নিয়মে তাও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।কিন্তু এত আশ্চর্যের সভ্যতা কীভাবেই বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হলো তা বিতর্কের বিষয়।আজ রইল এই  ইনকা সভ্যতা নিয়ে আমার নিবেদন।


মনে করা হয় আমেরিকার অন্যান্য জাতির মানুষদের মতো ইনকা সভ্যতার পূর্বসূরিরা বেরিং প্রণালী পার হয়ে এশিয়া থেকে আমেরিকা মহাদেশে আসে। আনুমানিক ১১০০-১২০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এদের একটি দল দক্ষিণ আমেরিকার অন্দিজ পর্বতমালার পেরুর উচ্চভূমির দিকে চলে আসে এবং এখানকার কুজবেন নামক স্থানে বসতি স্থাপন করে।স্থানের নামানুসারে এদের বলা হতো কেচুয়া জাতি। এরা এই অঞ্চলে জঙ্গল কেটে কৃষিভূমি উদ্ধার করে চাষাবাদ করতে থাকে। প্রাথমিক অবস্থায় এ জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলে একটি রাজত্ব গড়ে তোলে।প্রতিবেশী ছোটো ছোটো  গোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধের সূত্রে এদের ভিতরের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধারা সমাজে সম্মানিত এবং ক্ষমতাধর হয়ে উঠে আর এই সকল যোদ্ধারা সমাজের শাসক হত।

যে সমাজের শাসক হয় বীর সেই সমাজ বা জাতি যুদ্ধবাজ হবে এটাই নিয়ম তাঁরাও ব্যতিক্রম ছিল না। এরপর এই সকল যোদ্ধাদের সমর্থনে কেন্দ্রীয় নেতার উদ্ভব হয়েছিল যা আধুনিক সময়ে আমরা রাষ্ট্রগত চিন্তা বলি।ধীরে ধীরে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এই ব্যক্তি ‘কাপাক’ (capac) নামে অভিহিত হতে থাকে যার অর্থ ‘শাসক’ এবং মানুষ কেন্দ্রিয় সরকার বা ব্যবস্থার সাথে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।এই কেন্দ্রিয় সরকারের অধীনে ধীরে ধীরে এদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং ধীরে ধীরে এদের বসবাসের এলাকা বৃদ্ধি পায় যা পুরো ল্যাটিন আমেরিকা এমন কি উত্তর আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। এই সময় অন্যান্য ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়ে পরে এবং ক্রমেই আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে।ইনকা সাম্রাজ্যে অনেক নগরী গড়ে তোলা হয়েছিল।এগুলির মধ্যে কুজকো, করিক্যাঞ্চা, ওল্লান্টায়টাম্মো, মাচু পিচু ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।তবে মাচু পিচুই হল বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত এবং এখনও পর্যন্ত একে মানবসৃষ্ট অসাধারণ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বলে অভিহিত করা হয়।


১৪৫০ খ্রীস্টাব্দের সময় থেকে রাজনৈতিক,সামাজিক,অর্থনেতিক,এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে ইনকা সভ্যতায় এক স্বর্ণযুগের সূচনা হয়েছিল।মনে করা হয় এই সময়েই নির্মিত হয়েছিল মাচু পিচু নগরী।ইনকারাজ কাপাক পাচুকুটি (pachukuti) (১৪৩৮-১৪৭২)এই বিখ্যাত নগরীর পত্তন করেন বলে মনে করা হয়।তবে এই নগরীটি কেন তৈরি করা হয়েছিল তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। অনেকে মনে করেম নগরীটি ছিল সম্রাটের (পাচুকুটির) নিজস্ব সম্পদ। এখানে একটি শক্তিশালী দূর্গ তৈরি করা হয়েছিল। তাছাড়া এটি শীতকালীন রাজধানী হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। আবার অনেকে মনে করেন মাচু পিচু ধর্মীয়ভাবে পবিত্র স্থান ছিল।তবে কেউ কেউ বলেছেন, এটি আসলে ইনকা সম্রাটদের নির্মিত জেলখানা, যেখানে ভয়ংকর সব অপরাধীদের রাখা হতো। মাচু পিচু নিয়ে যত গবেষক কাজ করেছেন বা করছেন তাদের মধ্যে জন রো এবং রিচার্ড বার্গার ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাদের মতে মাচু পিচু ছিল সম্রাটদের অবকাশ কেন্দ্র।


স্পেনীয় উচ্চারণে শহরটির নাম মাচু পিচু হলেও অনেকেই এর নাম উচ্চাররণ করেন মাচু পিকচু হিসেবে, যার অর্থ ‘পুরানো চূড়া’। প্রকৃতপক্ষেই বেশ প্রাচীন শহর এটি। এমনকি কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারেরও আগের শহর এই মাচু পিচু।সমতল থেকে প্রায় ১৮০০ ফুট ও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে  প্রায় ২৪০০ মিটার বা, ৭,৮৭৫ ফুট উঁচু এই। এ‘উরুবাম্বা’ নামক এক উপত্যকার ওপরে পর্বত চূড়ায় অবস্থিত।কেচুয়া জাতির লোকেরা মূলত সূর্যের উপাসক ছিল। কেচুয়া জাতির লোকেরা এক সময় তাঁদের নেতাকে সূর্যপুত্র ভাবতো। সম্ভবত ইনকা শাসকরা নিজেদেরকে এইভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল।সেই সাথে যোগ দিয়েছিল ইনকা ধর্মের পুরোহিতরা। সূর্য দেবতার নামানুসারে সম্রাট নাম পেয়েছিল ইনকা। সম্রাট বিবাহ করতেন আপন বোনকে।তবে রাজ্যের সুন্দরী নারী উপহার পেলে, উপপত্নী হিসেবে তিনি গ্রহণ করতেন। এই কারণে প্রত্যেক সম্রাটের একটি প্রধান স্ত্রী থাকতো। সম্রাটের বড় ছেলে সম্রাট হতেন।


ইনকার শাসককুলের প্রধান ছিলেন সম্রাট। এরপরের ক্ষমতাধর ছিলেন অভিজাত শ্রেণি, ইনকার পুরোহিতকূল এবং সেনাপ্রধানরা। রাজধানীতে সম্রাটের ক্ষমতা যতটা ছিল, রাজধানী থেকে দূরের এলাকাগুলোতে তটটা ছিল না। দূরবর্তী অঞ্চল শাসন করতেন অভিজাত শ্রেণি, ইনকার পুরোহিতকূল এবং সেনাপ্রধানরাই।পুরো সাম্রাজ্য কতকগুলো প্রদেশে বিভাজিত ছিল। প্রাদেশিক শাসক হিসেবে সর্বোচ্চ পদে থাকতেন সামরিক বাহিনীর প্রাদেশিক অধিকর্তা এবং প্রাদেশিক পুরোহিত প্রধানরা।এদেরকে বিশেষভাবে সহায়তা করতেন অভিজাতশ্রেণির পরিবারগুলোকে। এঁরা অর্থ-সম্পদ দিয়েপুরোহিতকূল এবং সেনাপ্রধানদের সন্তুষ্ট রাখতেন। পুরোহিতকূল এবং সেনাপ্রধানরাও অভিজাতশ্রেণিকে নানাভাবে সমর্থন করতেন।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,এর সমসাময়িক ভারতের সুলতানি শাসনের প্রশাসনিক ব্যাবস্থাও এইরকমই আমরা প্রত্যক্ষ করি।ক্রমানুসারে ইনকা শাসকদের নাম ও সময়কাল হল- 

1438–1471-Pachacuti,(পাচুটি)
1471–1493-Túpac Inca Yupanqui,(য়ুপানকৈ)
1493–1527-Huayna Capac(হূয়ানা কেপাক)
1527–1532-Huáscar(হুয়াসয়ার)
1532–1533-Atahualpa.(আটুহালপা)।


মানুষমাত্রই সমাজবদ্ধ জীব কাজেই ইনকাদেরও সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। ইনকারা কঠোরভাবে  সামাজিক রীতিনীতিকে প্রাধান্য দিত। রাজা নিজের বোনকে বিবাহ করলেও, সাধারণ ইনকাদের ভিতরে এই জাতীয় কোনো বিধি ছিল না।এরা আপন বোন ছাড়াও অন্য যে কোনো কন্যাকে বিবাহ করতে পারতো। এক্ষেত্রে ইনকা ছেলেদেরকে কুড়ি বছর বয়সের আগে কন্যা পছন্দ করতে হতো। কোনো ছেলে কনে খুঁজে না পেলে, অভিভাবকরা কনে খুজে দিত। অনেক সময় কোনো কোনো অভিভাবক তার পুত্র সন্তানের জন্য কন্যা পছন্দ করে রাখতো।

কন্যার অভিভাবকরা তাতে রাজি হলে, ওই কন্যা বাগদত্তা হিসেবে অন্য কারো সাথে বিবাহ করতে পারতো না। বিবাহের দিন বর-কনে পরস্পরের হাত ধরে চন্দন বিনিময় করতো। এরপর বিবাহ উপলক্ষে সামাজিক ভোজ হতো। কিন্তু রাজ্যের সুন্দরী মেয়েদের অনেক সময় রাজার উপপত্নী করার জন্য পাঠানো হতো। এ বিষয়ে স্থানীয় পুরোহিত এবং সেনাশাসকদের বিশেষ ভূমিকা থাকতো।ইনকা সমাজে রাজা ছিল প্রজাবাৎসল কিন্তু কঠোর।কেও রাজার কাছে মিথ্যা নালিশ করলে তাঁকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হত।আবার কোনো ইনকা সাধারণ মানুষ নিপীড়িত হলে এবং সেই খবর রাজার কাছে পৌঁছালে সেই অঞ্চলের শাসনকর্তার গর্দান নেওয়া হত।

ইনকাদের আদিপুরুষরা শিকারী ছিল। পরে এরা ধীরে ধীরে কৃষিজীবী হয়ে পড়ে। সুতরাং এরাও বিপ্লব ঘঠিয়েছিল মনে করা হলে খুব একটা ভুল বলা হবে না।কারণ আমরা ইতিহাসের ছাত্রা সকলেই জানি যে,মানুষ প্রাচীন ও মধ্যপ্রস্তর যুগে খাদ্যসংগ্রাহক ছিল কিন্তু ধীরে ধীরে নব্যপ্রস্তর যুগে এসে খাদ্য উৎপাদকে পরিণত হয়েছে,যে প্রনালীর উত্তরণকে আমরা ইতিহাসে "নব্যপ্রস্তর যুগের বিপ্লব" বলে থাকি।যাই হোক,এদের প্রধান খাদ্য ছিল ভুট্টা ও আলু। এরা ভূট্টা থেকে এক ধরনের পানীয় তৈরি করে খেত। এই পানীয়ের নাম ছিল চিচা। পেরুতে এটি এখনো জনপ্রিয়। এছাড়া ওল, নীল শ্যাওলা, কাঁচা মরিচ খেতো। মাংসের মধ্যে ছিল গিনিপিগ ও ছাগল জাতীয় লামার মাংস।


সাগরের নিকটবর্তী এলাকার মানুষ সামুদ্রিক মাছ খেতো।  ইনকাদের বড় সাফল্য ছিল খাদ্য সঞ্চয়ে। সমগ্র সাম্রাজ্য জুড়ে অসংখ্য সরকারি খাদ্যভাণ্ডার ছিল। এছাড়া সাধারণ মানুষকে খাদ্য সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় এদের প্রায় ৫-৭ বছরের খাদ্য মজুদের ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। শস্য ছাড়াও তারা মাংস শুকিয়ে নোনা করে রাখতো

ইনকারা ধর্মের দিক থেকেও বেশ সক্রিয় ছিল।এদের প্রধান দেবতার নাম ছিল ভিরাকোকা। ইনকারা এই দেবতাকে তাদের জগৎস্রষ্টা হিসেবে মনে করতো। তবে সূর্য দেবতা ইনতি ছিল বিশেষ মর্যাদার দেবতা। ইনতির সন্তান হিসেবে এরা নিজেদেরকে ইনকা বলতো।এরা উচু কোনো পাহাড়ের উন্মুক্ত স্থানে পাথরের বেদী তৈরি করতো। এর উপরে সূর্যদেবতার প্রতীকী মূর্তি রাখা হতো। সূর্যমন্দিরের দায়িত্বে থাকতেন একজন প্রধান পুরোহিত এবং তাঁর কিছু সহযোগী পুরোহিত। এই মন্দিরকে বলা হতো ইনতি


ইনকারা অত্যন্ত সামাজিক ছিল। সেই কারণে এদের ভিতরে যৌথ পরিবারে প্রথা প্রচলিত ছিল। সাধারণ মানুষ ঘরের দেওয়াল তৈরি করতো পাথর, মাটি, ঘাস ইত্যাদি দিয়ে। কাদামটি, খড়, ঘাস ইত্যাদি দিয়ে ছাদ তৈরি করতো। ছাদগুলো ছিল বাংলাদেশের দোচালা বা চারচালা ঘরের মতো।দেয়ালে বায়ু চলাচলের জন্য ছোটো ছোটো চৌকো ফোঁকর ছিল। এই ঘরগুলো খুব বেশি মজবুত হতো না। ধনী পরিবারগুলোর ছিল বড় বড় প্রাসাদ। এগুলো মজবুত করে তৈরি করা হতো।


ইনকা সভ্যতার নমুনা সবচেয়ে ভালো অবস্থায় পাওয়া গেছে মাচু পিচু নগরীটিতে। দুই পর্বতশৃঙ্গের মধ্যবর্তী বন্ধুর উপত্যাকার ভিতরে পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে এই শহর তৈরি করা হয়েছিল। এখানে ছিল দীর্ঘ সিঁড়িপথ, বিশেষ ব্যবস্থায় তৈরি করা কৃষিভূমি, জলনিষ্কাষণ এবং পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা।এই বিশাল সাম্রাজ্যের ভিতরে যোগাযোগ রক্ষার প্রধান ব্যবস্থা ছিল, সড়কপথ। পুরো সাম্রাজ্য জুড়ে এরা সড়ক তৈরি করেছিল প্রায় ১৪ হাজার মাইল।



এই পথকে বর্তমানে বলা হয় ইনকা ট্রেইল। এই পথ ছিল মূলত পায়ে চলার উপযোগী। তবে স্থান বিশেষে মালামাল পরিবহনের উপযোগী গাড়ি চলাচলের জন্য রাস্তাও ছিল। স্থানের বৈশিষ্ট্য অনুসারে এই পথের প্রকৃতি নানাস্থানে নানা রকমের ছিল। সমতলভূমিতে বড় বড় পাথর বা কোথাও নুড়ি বিছিয়ে পথের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করতো।ফলে বর্ষার সময়েও কাদা এবং পিচ্ছিল অবস্থা থেকে পথচারী মুক্তি পেতো। পাহাড়ি অঞ্চলে এই পথ তৈরি করা হতো সিঁড়ি।কোথাও কোথাও ব্যবহৃত হতো প্রাকৃতিক পাহড়ি সমতলধর্মী বন্ধুর পথ। এই পথে সামরিক ও বেসামরিক সকল লোকই চলাচল করতো।

কালের নিয়মে সবই একদিন বিলিন হয়।এই ইনকাও তার ব্যতিক্রম নয়।তবে বেদৈশিক আক্রমনে এই সভ্যতার অন্ত হয়েছিল বলে মনে করা হয় এবং এই আক্রমণ ছিল এক বিশ্বাসঘাতকতা।এবং এর পিছনে স্পেনীয় নাবিক পিজারোর হাত কে প্রধান বলে মনে করা হয়।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,পিজারো স্পেনের তৎকালীন রাজা পঞ্চম চার্লস-এর কাছে পেরু দখল এবং সেখানকার শাসক হওয়ার অনুমতি চান। রাজা পঞ্চম চার্লস পিজারোকে এই অভিযানে অনুমতি দেন ।১৫৩২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বর্তমান পেরুতে পৌঁছান। ১৭৭ জন সৈন্য ও ৬২টি ঘোড়া নিয়ে কাজামারকা শহরে যাত্রা করেন। সে সময়ের ইনকা সম্রাট তখন আটাহুয়ালপা কাজামারকা শহরে অবস্থান করছিলেন।


পিজারো, কাজামারকা শহরের কাছে এসে ইনকা সম্রাটের কাছে স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা অনুমতি প্রার্থনা করেন। সম্রাট তাঁকে ঘোরাফেরার অনুমতি দিলে,১৫৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই নভেম্বর তিনি শহরে প্রবেশ করেন। ১৬ই নভেম্বর তিনি শহরের একটি খোলা জায়গায় আটাহুয়ালপা ও ইনকা অভিজাতদের ভোজে নিমন্ত্রণ করেন।ইনকা সম্রাট এবং অভিজাত শ্রেণির লোকেরা সরল বিশ্বাসে প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় নিমন্ত্রণ রক্ষা করার জন্য আসেন।এরপর স্প্যানিশ সৈন্যরা তাঁদের ঘিরে ফেলেন এবং সম্রাট ছাড়া সকল অতিথিদেরকে হত্যা করে। এরপর পিজারো সম্রাটের মুক্তি পণ হিসেবে এক ঘর ভর্তি সোনা আর দুটি ঘর ভর্তি রূপা দাবি  করেন। রাজ্যের অভিজাতরা পিজারোর সেই দাবি মেনে নেওয়ার পরও সম্রাটকে হত্যা করেন।


সম্রাটের মৃত্যুর পর ইনকাদের প্রতিরোধ করার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে, পিজারো ইনকার রাজধানী কুজকো দখল করে নেয়।ইনকা সাম্রাজ্যে স্প্যানিশদের দখলে আসার পর, এরা সমগ্র অঞ্চল জুড়ে হত্যা, লুণ্ঠনের তাণ্ডব চালায়। ইনকাদেরকে দাস হিসেবে বিক্রয়ের কার্যক্রম চালায়।পুরো পেরু অঞ্চল দখলে আসার পর, ১৫৩৫ খ্রিষ্টাব্দে পিজারো লিমা নামে একটি নতুন শহর প্রতিষ্ঠা করে এবং এই শহরে রাজধানী স্থাপন করে, পেরু শাসন করা শুরু করে।


এই সময় কৌশলী পিজারো, সম্রাট আটাহুয়ালপা-কে হত্যা করলেও, তার আরেক ভাই মানকো কাপাককে সিংহাসনে বসায়। ইতিমধ্যে লুটেরা স্প্যানিশদের মধ্যে স্বর্ণরৌপ্যের ভাগাভাগি নিয়ে হাঙ্গামা বাধে। মানকো তাদের এই হানাহানির সুযোগ নিয়ে পালিয়ে গিয়ে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ভিলকা বাম্বায় আশ্রয় নেয় এবং নতুন রাজধানী পত্তন করে। ১৫৪১ খ্রিষ্টাব্দে পিজারো ৬৬ বছর বয়সে লিমায় নিজ প্রাসাদে খুন হন।মানকো কাপাক  ভিলকা বাম্বায় থেকে স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে গুপ্ত যুদ্ধ পরিচালনা করা শুরু করেন। দীর্ঘদিন ধরে এই যুদ্ধ চলার পরও স্প্যানিশরা ভিলকা বাম্বার অবস্থানই জানতে পারে নি। ১৫৭২ খ্রিষ্টাব্দে স্প্যানীয়রা ভিলকা বাম্বার অবস্থান খুজেঁ পায় এবং মানকো-কে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। মূলত এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সর্বশেষ ইনকা সম্রাট ও তার সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়ে যায়।


সে সময় ইনকাদের রাজধানী ছিল কোস্কো। রাজধানী কোস্কো থেকে মাত্র ৮০ কি.মি. দূরেই অবস্থিত ছিল মাচুপিচু শহরটি। স্পেনীয়রা যখন ইনকা রাজ্য আক্রমণ করে তখন তারা এ শহরের কথা জানত না। ফলে অন্যান্য ইনকা নগরীর মত এ শহরটি তাদের দ্বারা আক্রান্ত হয় নি। ফলস্বরুপ এ শহরে লুটপাটের কোন ঘটনাও ঘটেনি। এরপর অনেক বছর এ শহর জন মানবহীন ছিল। ফলে শহরটি ধীরে ধীরে ঘন জঙ্গলে পরিনত হয় এবং ঢেকে যায়।

ষোড়শ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত স্পেনীয়রা কখনই মাচু পিচু শহরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে অবগত ছিল না।স্পেনীয়দের এ আক্রমণের পর  কেটে যায় আরো চারশ বছর। চারশ বছর যাবৎ এই ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহরটি লুকিয়ে ছিল বাইরের পৃথিবীর মানুষদের কাছে থেকে। অবশেষে ১৯১১ সালে আমেরিকান পুরাতত্ববিদ হিরাম বিংহাম এটির প্রতি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেন।এখানকার অসাধারণ দুর্গগুলোর অস্তিত্ব তখন শুধু সেই এলাকার আশে পাশে বাস করা কিছু কৃষকই জানতেন। বিংহাম গুপ্তধনের উদ্দেশ্যে অনুসন্ধান শুরু করেন ১৯০৯ সালে। এসময় তিনি তাঁর প্রথম অভিযানে বিফল হলেও দমে যাননি। আবার ইতিহাস ঘেঁটে শুরু করেন দ্বিতীয় অভিযান।

পথে দেখা হয় এক রেড ইন্ডিয়ানের সাথে। তার সহযোগিতায় উরুবাম্বা থেকে ২,০০০ ফুট উপরে প্রাচীন এই শহরটির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান বিংহাম।
মাচুপিচু অনেক প্রাচীন স্থাপত্যবিদ্যার স্বাক্ষর বহন করে। এখানকার স্থাপত্যগুলোর দেওয়াল পাথর নির্মিত। মজার বিষয় হল পাথরগুলো একে অপরের সাথে জোড়া দেয়ার জন্য কোন রকম সিমেন্ট বা, চুন-সুরকির মিশ্রণ ব্যবহৃত হয়নি। তাদের এই নির্মাণ কৌশলকে বলা হয় অ্যাশলার।এ কৌশলে তারা বেশ দক্ষ ছিল। এই পদ্ধতিতে পাথরের খন্ড কাটা হত খুব নিখুঁতভাবে। তারপর তাদের খাঁজে খাঁজে বসিয়ে দেয়া হত। ফলে সংযোগকারী সিমেন্টের কোন প্রয়োজন ছিল না। তাদের এই পদ্ধতিতে ইনকারা অত্যন্ত দক্ষ ছিল। তাদের নির্মিত পাথর এতই সুনিপুণ হতো যে একটা পাতলা ছুরির ফলাও দুই পাথরের মধ্যবর্তি ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করানো কার্যত অসম্ভব।


পেরু বেশ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা তা আমরা ভূগোল পড়লেই জানতে পারি। সাধারণ সিমেন্টের জোড়া হলে এই ভূমিকম্পে স্থাপনাগুলো টিকত না। কিন্তু পাথরের খাঁজে খাঁজ বসিয়ে তৈরি করা বলে মাচুপিচুর এই স্থাপনাগুলো বেশ ভূমিকম্পপ্রতিরোধী। এ কারণেই ইনকাদের এই শহর গত ৪০০ বছরে অসংখ্য ভূমিকম্প সহ্য করেও বহাল তবিয়তে টিকে রয়েছে।আশ্চর্যের বিষয় ইনকা সভ্যতায় চাকার দেখা পাওয়া যায় না। তারা কখনই তাদের ব্যবহারিক কাজে চাকার ব্যবহার করেননি। কিন্তু তাহলে কিভাবে ইনকারা এত বিশাল বিশাল আকৃতির পাথর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলো?তা এখনও এক বিশাল রহস্য। যদিও মনে করা হয় এই পাথরগুলো পাহাড়ের সমতল ঢাল দিয়ে ঠেলে ঠেলে ওপরে তোলা হয়েছিল। আর এ কাজে তারা ব্যবহার করেছিল শত শত শ্রমিক।

কিছু কিছু পাথরের গায়ে হাতলের মতো গাঁট দেখতে পাওয়া যায়। এমন হয়ে থাকতে পারে যে, এ গাঁটগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল পাথরগুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে বসাতে। পাথরগুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে বসানোর পর হয়ত হাতলগুলোকে গুড়িয়ে সমান করে দেয়া হয়েছিল।বর্তমানে এই মাচু পিচু শহরটিই ইনকা সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত শহর। ১৯৮১ সালে এই এলাকাকে পেরুর সংরক্ষিত ঐতিহাসিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় স্থান দেয়। বর্তমানে এটি বিশ্বের সপ্তাশ্চার্যের একটি।

নানা কল্পনা জল্পনায় ঘেরা ইনকা সভ্যতা এবং মাচু পিচুর ধ্বংসাবশেষ পুরো পৃথিবীর মানুষের কাছে এক বিস্ময়কর স্থাপত্যবিদ্যার নিদর্শন। প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটকদের সমাগমে মুখরিত হয় মাচু পিচু।

                          ------------------------

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভারতবর্ষে পর্তুগীজ আগমনের ইতিবৃত্তঃ- একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা।

প্রাচীনকাল থেকেই বৃহত্তর বঙ্গদেশ( বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম ) ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের এক অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। বাঙলার ক্ষেতের অফুরন্ত ফসল এবং তাঁতিদের হাতে বোনা কাপড়,ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধনসম্পদের লোভে যুগ যুগ ধরে দেশ-বিদেশের বণিকরা ছুটে এসেছে এই দেশে।ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ইউরোপীয় বণিকদের আনাগোনা শুরু হয় এই বাঙলায়। ইউরোপীয়দের মধ্যে সমুদ্রপথে পর্তুগিজরাই প্রথম বাঙলায়, তথা ভারতীয় উপমহাদেশে এসে পৌঁছায় ও বাংলাসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ করে। মুঘল সম্রাট আকবরের অনুমতিবলে হুগলীতে তারা পর্তুগিজ বন্দর-নগরী পত্তন করেছিল। সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে হুগলী ছিল বাঙলার অন্যতম প্রধান এক নগরী।তবে এখানে এসে তারা পরবর্তীসময়ে হার্মাদগিরি করার ফলে সম্রাট শাহজাহান সহ পরবর্তী সম্রাটদের বিরাগভাজনের কারন হন তারা।এসব বিভিন্ন কারণে সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে পর্তুগিজরা হুগলী ছেড়ে চলে যেতে শুরু করলে সেই স্থান দখল করে ইংরেজ ও ওলন্দাজরা । কিন্তু এখনো একটু খোঁজ করলেই হুগলীর পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায় – হয়ত কোন একটা এলাকার নাম, অথবা কোন একটা...

"জয়নগরের মোয়া-উপাখ্যান"

শীতকাল এলেই বাঙালীর যেটা সবার আগে মাথায় আসে তা হল নলিনগুড়,পিঠেপুলি,আর জয়নগরের মোয়া।এগুলো ছাড়া চলবেই না।আমরা সকলেই এইসব বিভিন্ন খাদ্যের সাথে পরিচিত।আজ এরকমই এক সুস্বাদু মিষ্টান্ন "জয়নগরের মোয়া" -র ইতিবৃত্ত তুলে ধরছি আমার ছোট্ট প্রবন্ধ-পটে।ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন। ইতিহাসের সাথে ভূগোলের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়।ভূগোল ছাড়া ইতিহাস সম্ভব নয়,সুতরাং ভৌগলিক দিক থেকে জয়নগর মজিলপুর হলো দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ছোট্ট একটা গ্রাম। প্রায় পাঁচশো বছর আগে আদি-গঙ্গা এইখান দিয়ে বয়ে বয়ে মিশে গিয়েছিলো বঙ্গোপসাগরে। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর শিষ্যদেরকে নিয়ে নীলাচলে যাবার সময় এখানে থেমে ছিলেন। সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় পরিপুষ্ট এই অঞ্চলটিকে অনেকেই পশ্চিম বাংলার 'দ্বিতীয় নবদ্বীপ' বলেও অভিহিত করে থাকেন। মোটামুটিভাবে ধরা হয়,১৯২৯ সাল নাগাদ এই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ দুই ব্যক্তি নৃত্যগোপাল সরকার (বুচকি বাবু) এবং পূর্ণচন্দ্র ঘোষ, দু'জনে মিলে সর্বপ্রথম 'মোয়া' নামক লোভনীয় মিষ্টান্নটির জন্ম দেন। তারপর সেই মোয়ার সুস্বাদ, সুঘ্রাণ আর গুণ ক্রমে ক্রমে সারা পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই, এ...

"কালাপাহাড়"- ইতিহাসে একজন ধ্বংসকারী হিসাবে পরিচিত

প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গল্পে একটি বিধ্বংসী মোষের নাম দিয়েছিলেন কালাপাহাড়। কে জানে কেন এমন নামকরণ! মোষ সে কালো, সে ভেঙেচুরে ফেলে—তাতে কালো হতে পারে। কিন্তু কালা তো বধির—যে কানে শুনতে পায় না। তাহলে যার কানে ভালো কথা প্রবেশ করে না—সে-ই ‘কালা’। কখনও কখনও পাহাড় কালো রঙের হয়, বিশাল চেহারার কাউকে আমরা পাহাড়ের সঙ্গে তুলনাও করে থাকি। বিরাট আকারের কালো রঙের মহিষ—কালাপাহাড়? কিন্তু এই কথাটা মনে এলেই মনে পড়ে এটা একজন বিরাট চেহারার দস্যু— যে ধর্ম মানে না— ধর্মস্থান গুঁড়িয়ে ফেলে লুঠতরাজ চালায় আর বড্ড গোঁয়ার গোবিন্দ। পাষাণের মতোই তার কঠিন মন— কারও কথায় কান দেয় না।একজায়গায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন এমন লোকের কথা ভেবেই—‘পিতামহের কীর্তির প্রতি কালাপাহাড়ি করা।’ তাহলে বোঝাই যাচ্ছে যে,লোকটা মোটেই সুবিধের ছিল না— সব কিছু ভেঙেচুরে নষ্ট করে ফেলাতেই যার প্রবল আনন্দ।তবে এর পিছনেও নির্দিষ্ট কারণ ছিল,ছিল হিন্দুধর্মের গোঁড়ামি,রক্ষণশীলতা,অস্পৃশ্যতা। তবে পরিচয়য়ের দিকে যাওয়া যাক এবার। কালাপাহাড় (১৫৩৪-১৫৮০ ) ছিলেন কররানী রাজবংশর এক দুর্ধর্ষ সেনাপতি। তার বাড়ি ছিল অধুনা বাংল...