দুনিয়া দেখার ইচ্ছে থাকলে এই সুযোগ! এবার দিল্লি থেকে লন্ডন যাওয়া যাবে বাসে।যদিও এটাই প্রথম নয়,হ্যাঁঃ এটাই প্রথম নয় এর আগেও ৬০ এর দশকে কলকাতা থেকে লন্ডন বাস চলাচলের রেকর্ড আছে ভারতবর্ষের ইতিহাসে।আজ এই দুই সময়ের বাসযাত্রা নিয়ে আমার এই ছোট্ট প্রতিবেদন।বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার রিপোর্ট এবিষয়ে আমায় সাহায্য করেছে।তাহলে আলোচনা করা যাক উপমহাদেশের বাস চলাচলের সাম্প্রতিক এবং চলমান ইতিহাস।
দিল্লি থেকে লন্ডন। তাও আবার বাসে। শুনেই চমকে উঠবেন হয়তো। এও কী সম্ভব! পকেটে টাকা আর মনে ইচ্ছে থাকলেই সম্ভব। গুরগাঁওয়ের অ্যাডভেঞ্চার ওভারল্যান্ড নামের একটি ট্যুর অ্যান্ড ট্র্যাভেল সংস্থা এবার দিল্লি থেকে লন্ডন পর্যন্ত বাস সার্ভিস চালু করল। শুনে প্রথমে চমকে উঠেছিলেন অনেকেই। এতটা রাস্তা বাসে যাওয়া কী সম্ভব! কতদিন লাগবে যেতে! খরচই বা কত! কোন রুট ধরেই বা যাওয়া হবে! এমনই হাজারো প্রশ্ন হয়তো আপনারও মনে জাগছে। সব প্রশ্নের উত্তরই আছে। ১৫ অগাস্ট এই বাস সার্ভিস-এর ঘোষণা করেছে সংস্থাটি। এই সংস্থার দুই কর্ণধার তুষার ও সঞ্জয় মাদান এর আগে গত তিন বছর দিল্লি থেকে লন্ডন সড়কপথে গিয়েছিলেন। তাঁরাই এই রোমাঞ্চভরা পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছেন।
দিল্লি থেকে লন্ডনগামী বাস যাবে মোট ১৮টি দেশের উপর দিয়ে। ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, চিন, কিজিঘিস্তান, উজবেকিস্তান, কাজাকিস্তান, রাশিয়া, লাটবিয়া, লিথুয়ানিয়া, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও ইউনাইটেড কিংডম। বুঝতেই পারছেন, ঘুরতে ভালবাসেন যারা তাদের কাছে এর থেকে ভাল সুযোগ আর আসবে না। ৭০ দিনের এই সফরে থাকবে সবরকম ব্যবস্থা। সংস্থাটি যাত্রীদের বিভিন্ন দেশে ফোর বা ফাইভ স্টার হোটালে থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। এছাড়া এই সফরে যাওয়ার জন্য মোট দশটি দেশের ভিসা থাকা জরুরি। যাত্রীদের ভিসার ব্যবস্থাও করে দেবে সংস্থাটি।
২০টি সিটের এই বাসে থাকবে বিশেষ ব্যবস্থা। ২০ জন যাত্রী ছাড়াও থাকবেন চারজন ড্রাইভার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ড্রাইভার, অ্যাটান্ডান্ট ও গাইড। একেক দেশে একেকজন গাইড থাকবেন। এছাড়া প্রতিটি সিট হবে বিজনেস ক্লাসের। এই বাস পরিষেবার নাম দেওয়া হয়েছে বাস টু লন্ডন। এবার আসা যাক খরচের ব্যাপারে। বাস টু লন্ডন পরিষেবায় চারটি ক্যাটেগরি থাকবে। কেউ যদি লন্ডন পর্যন্ত না যেতে চান তা হলেও সমস্যা নেই। তিনি কয়েকটি দেশ ঘুরে নিজস্ব উদ্যোগে ফিরে আসতে পারেন। সেক্ষেত্রে একরকম প্যাকেজ ধার্য করা হবে। তবে লন্ডন পর্যন্ত সফর করতে হলে একেকজনের খরচ হবে ১৫ লাখ টাকা। ইমিআই অপশন রয়েছে। যাত্রীরা চাইলে কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করার সুযোগ পাবেন।
এবার আসা যাক ৬০ এর দশকে চলাচল করা কলকাতা থেকে লন্ডনগামী বাস এর গল্প।এই বাস পরিচিত ছিল "অ্যালবার্ট" নামে, যে ছিল যথেষ্ট বিলাসবহুল। যার যাত্রাপথ একসময় পরিচিত ছিল পৃথিবীর দীর্ঘতম সড়কপথ হিসাবে।
ডাবল ডেকার এই বাস দেখতে ছিল যেমন চমৎকার আর ভাড়াটাও নেহাত কম স্মার্ট ছিল না। পাউন্ডের হিসাবে ৮৫। আর তখন ভারতীয় মুদ্রায় এই ঐতিহাসিক বাসরুটের ভাড়া ছিল ৭,৮৮৯ টাকা। যাত্রীরা সেই সময় এতটা পরিমাণ অর্থ খরচ করেই এই বাসে জায়গা পেতেন। জানা গেছে, প্রথমে লন্ডন থেকে জার্মানি, আস্ট্রিয়া বা প্যারিস হয়ে তারপর বেলগ্রেড, ইস্তানবুল, তুরস্ক, ইরানের তেহরান, আফগানিস্তানের হেরাত, কাবুল, পাকিস্তানের লাহোর হয়ে অমৃতসর থেকে দিল্লি হয়ে আসতো কলকাতায়।
'অ্যালবার্ট' নামের ওই ডাবল ডেকার বাসটি শুধু লন্ডন-কলকাতা পর্যন্ত গিয়েছিল এমনটা নয়। কলকাতা থেকে অ্যালবার্ট পাড়ি জমিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতেও। কলকাতা ও লন্ডনের মধ্যে অ্যালবার্টের ১৫টি ট্রিপ-এর রেকর্ড রয়েছে। আর লন্ডন থেকে সিডনি পর্যন্ত ৪টি ট্রিপ-এর রেকর্ডও রয়েছে। কোন পথে লন্ডন থেকে কলকাতায় আসত অ্যালবার্ট? সেই রুটটির তথ্যও সামনে এসেছে- লন্ডন থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথমে বেলজিয়ামে প্রবেশ করত। সেখান থেকে পশ্চিম জার্মানি হয়ে বাসটি অ্যালবার্টের নেক্সট ডেস্টিনেশন থাকত অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা। এরপর একে একে যুগোস্লোভাকিয়া, বুলগেরিয়া, তুরস্ক হয়ে অ্যালবার্ট প্রবেশ করত ইরানে। সেখান থেকে আফগানিস্তানের ভিতর দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান হয়ে ভারতীয় ভুখণ্ডে প্রবেশ করত অ্যালবার্ট। ভারতে প্রবেশ করার পর অ্যালবার্টের প্রথম স্টপ ছিল দিল্লি। এরপর আগ্রা। তারপরে ইলাহাবাদ এবং বেনারস। অবশেষে কলকাতায় এসে থামত অ্যালবার্ট। সম্প্রতি অ্যালবার্টের পরিষেবার একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। যেখানে ভিক্টোরি স্টেশনের সামনে অ্যালবার্টকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।
যাতে একটানা সিটে বসতে না হয় , তাই ভিতরে অ্যালবার্টের ডাবল ডেকার বডির ভিতরে অনেকটাই হাল ফ্যাশানের স্টাইলের গদিওয়ালা লম্বা সিটের পাশেই ছিল বড়সড় জানালা। চলাচল করার জন্য অনেকটা জায়গা। জুতো ডেবে যাবে, মেঝেতে এমন দামি কার্পেট। ছিল বই পড়ার জায়গা। তবে শুধু ঘোরানো নয় ছিল খাওয়াদাওয়ার ব্য়বস্থাও। সেই খরচটাই বাসের টিকিটের ওই টাকার মধ্যেই যুক্ত থাকত। তাই ছিল আস্ত বড় একটা ডাইনিং রুমও।
বিনোদনেরও বিপুল আয়োজন করে রেখেছিল 'অ্যালবার্ট'। রেডিও এবং মিউজিকেরও এলাহি ব্যবস্থা ছিল। বাসের মধ্যে ছিল শরীর গরম রাখার জন্য ফ্যান, হিটার। তবে পৃথিবীর মধ্যে এটাই ছিল তখন বাস পরিষেবার সবচেয়ে দীর্ঘতম রুট।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্, অ্যালবার্টের ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, সেন্ট্রাল ওয়েস্টার্ন ডেইলি-র তথ্য অনুসারে, ২১ বছরের অনুগত পরিষেবার পরে অস্ট্রেলিয়ায় দুর্ঘটনার সম্মুখিন হয়েছিল একটি বাস। এরপর তা যাত্রীদের ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। অ্যান্ডি স্টুয়ার্ট নামে এক ব্রিটিশ, যিনি বাড়ি ফেরার উপায় খুঁজছিলেন। তিনি ১৯৬৮ সালের মে মাসে সিডনিতে বাসটি কিনে নেন এবং বাসের ভিতরে কাঠামোর আমূল পরিবর্তন করেন। অ্যান্ডি কার্যত এই বাসটিকে একটা চলমান লাক্সারি বাড়ি-র আকার দেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সিডনি থেকে বাস নিয়ে লন্ডনে বাড়িতে পৌঁছবেন। বাসটি সংস্কারের সময় যাত্রীদের বসার জায়গায় মোট ১৩ লাক্সারি ইউনিট তৈরি করিয়েছিলেন অ্যান্ডি। রুট হিসাবে বেছেছিলেন সিডনি টু কলকাতা এবং তারপর সোজা লন্ডন।
একটা সময় পৃথিবীর সবথেকে লম্বা বাস রুটের মালিক ছিল সে। এটা যে সময়ের কথা, তখনও ক্যালকাটা ‘কলকাতা’ হয়নি। সালটা ১৯৬৮। অ্যান্ডি স্টুয়ার্ট নামের এক ব্রিটিশ পর্যটক সিডনি থেকে নিজের শহর লন্ডনে ফেরার পরিকল্পনা করেছিলেন। তার জন্য ঠিক করলেন একটি রোমাঞ্চকর জার্নি। একটা মনোরম, সুন্দর ডাবল ডেকার বাস নিলেন; সঙ্গে জুটল আরও ১৩ জন। সবাই মিলে ’৬৮-এর অক্টোবরে সিডনি থেকে পাড়ি দিলেন লন্ডনের দিকে। কলকাতায় পৌঁছনোর আগে ট্রেন এবং জাহাজে করেই পাড়ি দিয়েছিলেন। কলকাতা থেকে শুরু হয়েছিল টানা রাস্তা। তৈরি হল পৃথিবীর সবথেকে লম্বা বাস রুট। জন্ম হল ‘অ্যালবার্ট’-এর…সত্তরের দশকে রীতিমতো বিখ্যাত ছিল এই বাসটি। ভেতরে ফাইভ স্টার বন্দোবস্ত; স্বাভাবিকভাবেই খুব বেশি যাত্রী নেওয়া যেত না। আর অনেকের সামর্থ্যও ছিল না। কলকাতা থেকে লন্ডনে যাওয়ার সিঙ্গল ট্রিপের ভাড়া ছিল ৮৫ পাউন্ড, যা তখনকার হিসেবেও বেশ দামি ছিল। কিন্তু যারা চড়তেন, তাঁরা এক অদ্ভুত অ্যাডভেঞ্চারের সাক্ষী থাকতেন। মোট ১৫০টি সীমান্ত পেরোত অ্যালবার্ট, তবে সমস্যা হয়নি কোনো। মূলত কলকাতা আর লন্ডনের মধ্যে হলেও, চারটে ট্রিপ করা হয় সিডনি থেকেও। শেষ ট্রিপটি ছিল ১৯৭৬ সালে। যাত্রা থামলেও, ইতিহাস কি আর সহজে ভোলা যায়!
সিডনি থেকে ভায়া কলকাতা হয়ে লন্ডন-এর রাস্তার দূরত্ব ছিল ১৬ হাজার কিলোমিটারের সামান্য কিছু বেশি। হাইরোড অফ ওজি নামে অস্ট্রেলিয়ার একটি সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, ১৯৬৮ সালের ৮ ই অক্টোবর সিডনির মার্টিন প্লেসের জিপিও-র সামনে থেকে এই বাসের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৩২ দিন পরে কলকাতা হয়ে অ্যালবার্ট প্রথম যখন লন্ডনে পা রাখে, তারিখটা ছিল ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯।
হাই রোড ফর অজি-র দাবি অনুযায়ী, ৪,৫,৬, ৭, ৮ এবং নম্বর ট্রিপ ছিল লন্ডন থেকে সিডনি। মাঝে হল্ট বাস স্টপ কলকাতা। দাবি অনুযায়ী, ১২, ১৩,১৪ ও ১৫ নম্বর ট্রিপ হয়েছিল লন্ডন থেকে কলকাতার মধ্যে।
কলকাতা থেকে লন্ডনের মধ্য়ে যাতায়াতে সময় লাগত ৪৯দিন। ১৯৭২ সালের ২৫ জুলাই অ্যালবার্ট কলকাতার উদ্দেশ যাত্রা শুরু করেছিল। কলকাতায় যখন অ্যালবার্ট এসে থামে, সেদিন তারিখটা ছিল ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭২। অ্যালবার্ট তার এই যাত্রা পথে ১৫০টি সীমান্ত পার করত। কিন্তু, কোনওদিনই তাকে নিয়ে সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে কোনও বিতর্ক হয়নি। বরং অ্যালবার্ট তারা বিশ্বের দূত হিসাবে পরিচয় দিত।
এভাবেই অ্যালবার্ট নিজ যাত্রাপথে ধাবিত হয়েছিল।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,বর্তমানে যে দিল্লি থেকে লন্ডনগামী বাস চালু করার কথাবার্তা চলছে সেই বাস কতটা "অ্যালবার্ট"এর মতো সফলতা পায় সেটাই দেখার।।
---------------------------
★★তথ্যসূত্রঃ:-
1.Times of India Link:-https://timesofindia.indiatimes.com/india/calcutta-london-bus-resurfaces-riding-on-old-photos-memories/articleshow/77030308.cms
2.Quora Digest link:-https://www.quora.com/Was-there-any-London-to-Kolkata-bus-service
3.News 18 Link :-https://www.news18.com/news/buzz/a-bus-ride-from-london-to-kolkata-in-1950s-yes-the-viral-photo-is-real-2696673.html
4.Times of India Link:-
https://timesofindia.indiatimes.com/travel/travel-news/delhi-to-londonworlds-longest-bus-voyage-to-start-in-2021/as77701943.cms
5.Indian Express Link:-https://indianexpress.com/article/lifestyle/destination-of-the-week/you-will-soon-be-able-to-plan-a-road-trip-to-london-find-out-how-6566438/
6.Wikipedia---Internet.
The end.
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন