সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

এক দৃষ্টিহীন ক্রিকেটারের করুন পরিণতি

ময়ের হাতে কাকে কখন আত্মবলিদান দিতে হয় সেকথা কারোরই আগে থেকে জানা থাকেনা। আজকের আমির কালকের ফকির। সময়ের এই অবাক বিচারে এমনটাই হয় অনেকসময়। আমরা সাধারণ মানুষরা তো এরকম বহু সাক্ষী থেকেছি। কখনও কখনও আমাদের নিজেদের সাথেই এমন ঘটেছে। আর শুধু আমার আপনার মত সাধারণ মানুষদের জীবনেই নয়। খারাপ ভালো রয়েছে বহু তারকাদের জীবনেও। সময় তাদেরও বহুবার অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। খ্যাতিচ্যুত পথে দাঁড়ানোর মত অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে বহু তারকাই। সেসব গল্প হয়তো অধিকাংশ সময়ই চাপা পরে যায়, প্রকাশ পায়না। কিন্তু কালকের সেই বিখ্যাত মানুষটা আজকে কোথায়? আগ্রহ তো থাকেই মানুষের। তাই এরকমই একজন হারিয়ে যাওয়া এমনকি সবকিছু হারিয়ে ফেলা এক মানুষকে নিয়েই রইল আজকের পরিবেশন। যার বর্তমান পরিস্থিতি জানলে চোখের জল ধরে রাখতে নেহাৎ একটু নয় খুব কষ্টই হবে।

বিশ্বকাপে দেশের হয়ে ক্রিকেটে প্রতিনিধিত্ব করা সর্বদাই গর্বের বিষয়।এমনই স্বপ্ন দেখেছিলেন গুজরাটের এক ছোট্ট গ্রামের অধিবাসী বালাজী ডাগোর।তিনি জন্ম থেকেই ছিলেন দৃষ্টিহীন,কিন্তু কোনো প্রতিবন্ধকতাই তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। দৃঢ় মনোবল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর।এবং ছোটো থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা থাকায় তাকেই পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন।তাই দ্বাদশ শ্রেণী পাস করার পরেই ইদারের একটি ক্রিকেট ক্লাবে ভর্তি হন।

         ★ছবি-টাইমস অফ ইন্ডিয়া

ক্রিকেটে অনেক দূর এগিয়েও গিয়েছিলেন তিনি। বিভিন্ন সময় পেয়েছিলেন অনেক পুরস্কার,শংসাপত্র ও সম্মান।একটি ক্লাবের খেলায় তিনি নগদ ৩০০০ টাকা পুরস্কার ও পেয়েছিলেন।আপ্রাণ মনোবল ও হার না মানা চেষ্টায় তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন ভারতীয় দৃষ্টিহীন ক্রিকেট দলে।এবং এতই ভালো খেলতেন যে ১৯৯৮ সালে দৃষ্টিহীনদের ক্রিকেট বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের অধিনায়ক হয়েছিলেন। অলরাউন্ডার হিসাবে ভারতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করে ভারতকে সেমিপাইনালে পৌঁছে দেয়। যদিও ওই বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে সেমিফাইনালে হেরে গিয়েছিল ভারত।

ব্যাট ও বল হাতে তার পারফর্ম্যান্স ছিল নজরকাড়া। ভারতীয় ব্লাইন্ড ক্রিকেট দলের একজন ক্রিকেটার ধুঁকতে থাকা ভারতীয় দলটিকে লড়াইয়ে ফিরিয়ে দেন। নিয়ে যান সেমিফাইনাল পর্যন্ত। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি কেআর নারায়ানান পর্যন্ত মুগ্ধতা প্রকাশ করেন তাঁর খেলা,দেখে।আজও সেই ক্রিকেটারের নামের পাশে সর্বোচ্চ উইকেট টেকার কথাটি জ্বল জ্বল করে।এছাড়া,অজস্র পুরস্কার ও সম্মানে সম্মানিত হন তিনি।বিশ্বকাপের পরে বালাজি ভেবেছিলেন একটা চাকরিও জুটে যাবে তার।ভাগ্য তার এতটাই খারাপ যে তাও জোটেনি।মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল।

             ★ছবি-টাইমস অফ ইন্ডিয়া

কিন্তু একসময় রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার নেওয়া খেলোয়াড়ের বর্তমান অবস্থার কথা জানলে হয়তো অনেকেই শিওড়ে উঠবেন।সেই ১৯৯৮ সালে ব্লাইন্ড ক্রিকেট টিমের নজির সৃষ্টিকারী এই বালজীকে বর্তমান প্রজন্ম চেনে না। কিন্তু কেমন আছে বালাজি? কোথায় আছেন? 

একদা দেশকে বিশ্বকাপের লড়াইয়ে ফিরিয়ে দেওয়া তারকা ক্রিকেটারটি এখন অভাবের তাড়নায় প্রচন্ড গরীব পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য বাবার পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত ছোটো জমিতে খেতের কাজ করছেন এবং গবাদী পশু মহিষ প্রতিপালন করছেন।বর্তমানে বয়স তাঁর ৩৮। বিশ্বকাপের শেষে ভেবেছিলেন যে একটি চাকরি পেয়ে যাবেন কিন্তু তা তিনি পাননি।ফলে এইভাবে মহিষ চড়ানোর পেশাই বাধ্য হয়ে বেছে নিতে হয়।বর্তমান অবস্থা এতটাই করুন যে সমগ্র পরিবার একটি ছোট্ট ঘরে বসবাস করে এবং তার স্ত্রীও তার সাথে ক্ষেতে কাজ করে সংসার চালান।ক্ষীণকায় শরীর, তবুও ক্রিকেটিও ভঙ্গিমা ফুটে ওঠে তাঁর চেহাড়ায়।এই ভাবেই সেই বিশ্বকাপ হিরো স্ত্রী, সন্তান নিয়ে দিনগুজরান করছেন গুজরাটের একটি গ্রামে। সময় বয়ে গেছে অনেক তবুও এই প্রতিভাবান ক্রিকেটার নিজের সেরা খেলাটির কথা আজও ভুলতে পারেন না।

দৃষ্টিহীন ক্রিকেটারদের মধ্যে সর্বাধিক রেকর্ডযুক্ত এই ক্রিকেটারটি মোট ৮ টি দেশের সাথে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে তার মোট রান করেন ৩১২৫ এবং ১৫০ উইকেটের অধিকারী ছিলেন তিনি।এখনও সর্বোচ্চ উইকেট প্রাপ্তি তাঁর নামের পাশে জ্বল জ্বল করছে।তাঁর বন্ধু ও সহ খেলোয়াড় দের কাছে তিনি শচিন তেন্ডুলকর নামে পরিচিত ছিলেন। "National Association for Blind "-এর ভাইস প্রসিডেন্ট ভাস্কর মেহেতা একসময় বলেছিলেন -"ভারতীয় দৃষ্টিহীন দলে বালাজীর মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুব কমই দেখেছেন "

কিন্তু সময় অবিচার করেছে বালাজির ওপর। অবিচার করেছে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনও।কিন্তু চিরাচরিত ক্রিকেটাররা যেমন ধন,দৌলত,সম্মান,মর্যাদার সবই কেরিয়ারের মধ্য ও শেষ জীবনে উপভোগ করে থাকেন।বালাজী সেইসব থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।কিন্তু কেন?হয়ত ভাগ্য হয়ত তার সাথে ছিল না।একদা ভারতীয় বিশ্বকাপ অধিনায়ককে মহিষ চড়িয়ে জীবনধারন করতে হচ্ছে সত্যিই এটা,হৃদয়বিদারক।তার তো বাস্তব।দৃষ্টিহীন বলেই কি এই বৈষম্য?প্রশ্ন তো থেকেই যায়।কিন্তু এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই।

বর্তমানে আমরা,প্রায়শই স্পেশাল ক্যাটাগরি বা প্রতিবন্ধী মানুষদের উপর সহনশীল মনোভাব দেখাই।সরকারী ভাবে তাদের জন্য অনেক স্কিম খোলা হয়।কিন্তু সত্যই কি তাদের অভাব মোচনের জন্য সবকিছু বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। যদি তাই হতো তাহলে এখনও কেনো বাসে এইসব মানুষদের উপর হামলা,স্টেশনে তাদের পকেট মারী র মতে ঘটনা ঘটে? সর্বোপরি ক্রিকেটার বালাজী দামরু ভারতীয় অন্যান্য ক্যপ্টনদের মতোই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারত, যেখানে তাদের থাকত না কোনো অভাব। " Blind people's Association of India "-এর তৎকালীন সভাপতি ভূষন পুনারই আক্ষেপের সুরে বলেন যে "স্পেশাল ক্যাটাগরির খেলোয়ারদের অন্যান্য খেলোয়াড়দের মতো এতটা সম্মান, সুযোগসুবিধা দেওয়া হয় না।"তাই হয়ত বালাজীকে আজ নিজের জীবনযুদ্ধ সামলাতে করতে হচ্ছে কৃষিকাজ,চড়াতে হচ্ছে মহিষ।।

                        -------------------------

★ তথ্যসূত্রঃ- 
1) Times of india Report,link- http://toi.in/7-CUja/a33gj
2) Asian Voice English Report,12 july 2015.
3) ইউটিউব লিঙ্ক - https://m.youtube.com/watch?v=xwPzj0oYfPs&feature=youtu.be
4) https://youtu.be/MDK6aREr1i8
 2015.
5)সমস্ত ছবি টাইমস অফ ইন্ডিয়া থেকে গৃহিত।

মন্তব্যসমূহ