বর্তমান করোনা সংক্রমিত বিশ্বে "হাত ধোওয়া" সূর্য ও চন্দ্র উদয়ের মতোই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া।কিন্তু আপনি কি জানেন ১৬০ বছর পূর্বে এই হাত ধোওয়া-র আবিষ্কর্তাকে এই প্রক্রিয়া আবিষ্কারের জন্য পিটিয়ে মারা হয়েছিল,চিহ্নিত করা হয়েছিল পাগল বলে।ঠিক যেমন কোপারনিকাস,গ্যালিলিও ও ব্রুনোকে তাঁদের মৌলিক চিন্তা ভাবনার জন্য মাশুল দিতে হয়েছিল।
এবার আসা যাক আসল কথায়।প্রায় ১৬০ বছর আগের কথা। হাঙ্গেরিয়ান চিকিৎসক ইগনাজ ফিলিপ স্যামেলওয়াইজ প্রথম কাজ শুরু করেছিলেন ভীয়েনা জেনারেল হাসপাতালে।অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি ভিয়েনা জেনারেল হাসপাতালে প্রসূতি মৃত্যুর হার ছিল খুব বেশি। সাধারণের চেয়ে তিনগুণ বেশি প্রসূতি মারা যেতেন। চাইল্ড বেড ফিভার নামের এক ধরণের অসুখে আক্রান্ত ছিল তখনকার শিশুরা।এরফলে প্রসূতিদের জন্মদেওয়া বাচ্ছারাও মারা যেত।তখন তিনি খুঁজে বের করতে চেয়েছিলেন যে,কেন এই বিভাগের বাচ্চারা মারা যাচ্ছে।সুতরাং তিনি অবিলম্বে পর্যবেক্ষন শুরু করলেন।
★ভিয়েনা জেনারেল হাসপাতাল
ছবিঃ-ইন্টারনেট।
হাসপাতালে দুটি প্রসূতি বিভাগের ওয়ার্ড পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অধ্যয়ন করার পর লক্ষ্য করলেন যে,হাসপাতালের দুটি ওয়ার্ডে দুরকমের চিকিৎসক দায়িত্বে আছেন।একটি বিভাগে রয়েছেন পুরুষ ডাক্তার এবং তাঁদের মেডিকেল শিক্ষার্থীরা।এবং অপর বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন মহিলা চিকিৎসক বা ধাত্রীরা।এবং রহস্যজনকভাবে দেখা যায় যে,পুরুষ ডাক্তারদের ওয়ার্ডের শিশু মৃত্যুর হার এই মহিলা চিকিৎসকদের বিভাগের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি।কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ডাক্তার স্যামেলওয়াইজ উঠে পড়ে লাগলেন।এবং শেষপর্যন্ত তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের দ্বারা তিনি দেখলেন যে,মহিলা চিকিৎসকেরা শুধু ওই প্রসূতি ওয়ার্ডেই কর্মরত ছিলেন।কিন্তু পুরুষ চিকিৎসক এবং তাঁদের ছাত্রদের ময়নাতদন্তও করতে হত।এবং তাঁদের বাচ্ছা প্রসবের জন্য প্রায়ই ময়নাতদন্ত করতে করতে ছুটে আসতে হত।তাই সেমেলওয়েস অনুমান করেছিলেন যে,ডাক্তার এবং শিক্ষার্থীদের হাতগুলি তাদের বিচ্ছিন্ন করা লাশগুলি থেকে জীবানু বহন করছে।এবং যখন তারা বাচ্ছা প্রসব করাচ্ছে তখন তাদের হাত থেকে এই দূষিত জীবানু প্রসবকারী মহিলার দেহে স্থানান্তরিত হচ্ছে।তারপর জীবানুগুলি সেই মহিলা ও তাদের বাচ্ছাদের দেহে বিকাশলাভ করে মৃত্যু ঘটাচ্ছে।
★হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ড
ছবি-ইন্টারনেট।
সুতরাং অহেতুক মৃত্যু বন্ধ করতে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন হাত ধোওয়ার জন্য।তিনি তাঁর মেডিকেল কর্মী, হাসপাতালের ডাক্তার এবং তাদের মেডিকেল ছাত্রদের নির্দেশ দেন গর্ভবতী মহিলাদের পরীক্ষার আগে ভাল করে ক্লোরিনেটেড লাইম বা ক্লোরিনের দ্রবণে হাত ধোওয়ার জন্য। এবং সেই সঙ্গে রোগীর পরীক্ষায় ব্যবহার করা যন্ত্রপাতিও ধুয়ে নেওয়ার কথাও বলেন।এটি হয়েছিল তখনকার দিনে তার কড়া অপরাধ।ভিতরে ভিতরে ক্ষুব্ধ হলেও ডাক্তাররা সেসময় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।তবে তাঁর এই জোর করে হাত ধোওয়ার নির্দেশ দেওয়ার ফলে নাটকীয়ভাবে বাচ্ছাদের জ্বরের হার হ্রাস পেয়েছিল।হ্রাস পেয়েছিল মৃত্যুহারও ৯৯ শতাংশ।পুরো এক বছরে একজনও হাসপাতালে মৃত্যু বরণ করলেন না।
এখন আপনি এই ভেবে শিহরিত হবেন যে, তিনি এই একটি মারাত্মক সমস্যার সমাধান করলেন। এর জন্য তাঁকে কত সম্মান প্রদান করা হবে।না,সেসব কিছু করা হয়নি উল্টে তাঁকে পাগল বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল।মারা হয়েছিল পিটিয়ে।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সেমেলওয়াইসের জীবানু সম্পর্কে তেমন কোনো ধারনা ছিল না।তিনি ক্লোরিনের দ্রবণ বেছে নিয়েছিলেন কারণ তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে লাশের উপরে ছোটো ছোটো কণার গন্ধ ও জীবানু থেকে মুক্তি পাওয়ার এটাই সেরা উপায়।
★ডঃ স্যামেলওয়াইসের আবিষ্কার জীবানুর থেকে মুক্তি পেতে হাত ধোওয়া, ছবিঃ-ইন্টারনেট।
স্যামেলওয়াইজ খুশি হয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পরিচ্ছন্নতার কথা বলতে ও লিখতে শুরু করলেন। তবে জীবাণু সম্বন্ধে ধারণা না থাকায় সে এর কারণ বলতে পারেন নি এবং এর প্রমান দিতেও পারেননি। তবে নানা রকম পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন তিনি।তবে ডাক্তার ও বিজ্ঞানীরা বেঁকে বসলেন।যারা তাঁর এই কথা,মেনে নিতে পারলেন না তারা প্রকাশ্যে স্যামেলওয়াইজের নিন্দা শুরু করলেন। তবে কি রোগী মারা যাওয়ার জন্য ডাক্তারদের দোষারোপ করছেন স্যামেলওয়াইজ? এইভেবে এবার বেঁকে বসলেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও।
হাঙ্গেরিতে নিজের ঘরে ফিরে এলেন স্যামেলওয়াইজ। অনেক ভেবে কিছু পরীক্ষানিরীক্ষাও করলেন। এরপর ১৮৬১ সালে এক বিজ্ঞান পত্রিকায় গবেষণামূলক প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি জানালেন টয়লেট ব্যবহার করে ছোটখাটো অপারেশন বা রোগীকে পরীক্ষা করার পর চিকিৎসকদের ভালো করে হাত ধুয়ে নেওয়া উচিত। কারণ তিনি বারবার দেখেছেন, মর্গ থেকে এসে ডাক্তাররা যখন রোগী দেখেন তখন মৃতদেহ থেকে ভয়ঙ্কর কিছু উপাদান রোগীর মধ্যে চলে আসে। তাতেই অনেকে মারা যান।
★পরীক্ষারত স্যামেলওয়াইস,
ছবিঃ-ইন্টারনেট।
এতেও কোনো লাভ হলো না। কারণ তখন ডাক্তার কিংবা বিজ্ঞানী সবার বিশ্বাস ছিল রোগ-শোক-মৃত্যুর কারণ হচ্ছে দুষ্ট আত্মা। মানুষের সাধ্য নেই তাকে অতিক্রম করে। অন্যান্যদের সঙ্গে সঙ্গে স্যামেলওয়াইজের স্ত্রীও ভাবতে শুরুর করলেন যে তিনি পাগলের মতো কথাবার্তা বলছেন।হাল ছাড়লেন না স্যামেলওয়াইজ। এবার স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ করলেন, যাতে হাত ও যন্ত্রপাতি ধুয়ে তবে রোগী পরীক্ষা করেন বা অপারেশন করেন।কারন মানুষের প্রাণ বাঁচানোর একমাত্র বড় রাস্তা এটিই। আর সব জেনেও যদি তারা পরিচ্ছন্নতার কাজটুকু না করেন তাহলে ধরে নিতে হবে তারা নিজের অজান্তে মানুষ খুন করার মতো অপরাধ করছেন।
এবার পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলো। সবাই মিলে তাকে পাগল বলতে থাকলো। ১৮৬৫ সালে নার্ভাস ব্রেকডাউন হওয়ার পর তাকে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে পাঠানো হল মানসিক হাসপাতালে। কেউ কেউ বললেন ‘নিউরো সিফিলিস’ হয়েছে, আবার কেউ বললেন আত্মা ভর করেছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁর স্ত্রীও তাঁর পাশে দাঁড়ালেন না,মনে করলেন সত্যিই হয়তো তিনি মানসিক ভারসম্য হারিয়েছেন।হাসপাতালে চিকিৎসার পরিবর্তে শুরু হল মারধর। ১৪ দিনের মাথায় মারের চোটে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলেন তিনি। কোনও চিকিৎসার সুযোগ পেলেন না, সেভাবেই পড়ে রইলেন। পচন ধরল ডান হাতে, সেখান থেকে বিষ ছড়িয়ে পড়ল সারা শরীরে।১৮৬৫ সালের ১৩ আগস্ট বিনা চিকিৎসায় মাত্র ৪৭ বছর বয়সে সেপ্টিসেমিয়া হয়ে মারা গেলেন এই জীবানু তত্ত্বের জনক । তার শেষকৃত্যে উপস্থিত হলেন না এক জন চিকিৎসকও। তাকে নিয়ে এক কলমও লেখা হল না হাঙ্গেরিয়ান মেডিক্যাল সোসাইটিতে।
কিন্তু কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যান নি তিনি। দেরিতে হলেও তার মূল্যায়ন হয়েছে বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের হাত ধরে। স্বীকৃতি পেয়েছে তার গবেষণা। জীবাণু তত্ত্ব, অর্থাৎ জীবাণু থেকে রোগ হতে পারে তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয় তাঁর নাম। হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট আজও তার স্বাক্ষ্য বহন করছে।
★জীবানু তত্ত্বের জনক
ইগনাজ ফিলিপ স্যামেলওয়াজের পথিকৃতি,ছবিঃ-ইন্টারনেট।
অতএব যাহা সত্য তা চিরকালীন সত্যই থাকে,তাকে রক্ষণশীলতার আবহে গলাটিপে রোধ করতে চাইলেও সেই সত্য চাপা পড়ে যায় না, একদিন না একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়ই।তাহা যেমন মধ্যযুগের ইউরোপে গ্যালিলিও,কোপারনিকাস,ব্রুনো নিজের প্রাণ দিয়ে প্রমান করার চেষ্টা করেছিলেন,সেরকম ই আধুনিক যুগে হাঙ্গেরিয়ান ডাক্তার স্যামেলওয়াইজও নিজের প্রাণ দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করে গেছেন।করোনা আতঙ্কিত এই পৃথিবী আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো স্যামেলওয়াইজের আবিষ্কারের সার্থকতা।
-----------------------
★★★উপরিউক্ত প্রবন্ধটি কোনো গবেষণাপত্র বা এরূপধর্মী কোনো কাজ নয়।কতকগুলি সংগৃহিত [বিভিন্ন বই,ইন্টারনেট,উইকিপিডিয়া,Article,বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম থেকে নেওয়া তথ্য] তথ্যের ছাত্রপাঠ্য এবং সুখপাঠ্য বিশ্লেষণ মাত্র।এরূপ ইতিহাসের আরও ছোটো বড়ো গল্প, প্রবন্ধ,আলোচনা পড়ার জন্য আমার ব্লগটি ফলো করুন সকলে। যথাযথভাবে আরও লেখার পরিবেশনের চেষ্টা করব।।
পড়ে খুব ভালো লাগলো দাদা।
উত্তরমুছুনkhub bhalo
উত্তরমুছুন