সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

৬২ বছর পেরিয়েও, নস্টালজিয়ার অপর নাম 'নটরাজ' ও 'অপ্সরা' পেনসিল।

"কাকটা কিছু জবাব দিল না, খালি পেনসিল মুখে দিয়ে খানিকক্ষণ কী যেন ভাবল। তার পর বলল, সাত দুগুণে চোদ্দোর নামে চার, হাতে রইল পেনসিল"। সুকুমার রায়ের "হ য ব র ল" র কাক্কেশ্বর ঠিক কোন কোম্পানির পেনসিলে অঙ্ক কষেছিল তা হয় তো আমাদের জানা নেই, কিন্তু পেনসিল বলতে বাঙালির স্মৃতিতে চিরকালীন অভ্যেস তৈরি করেছে সেই লাল-কালো খোলসের নটরাজ পেন্সিল আর ছাইরঙা অপ্সরা পেনসিল। একথা সবাই বেশ জানে।

                    নটরাজ পেনসিল

শুধু নাম আর খোলসই নয়, নটরাজ বা অপ্সরার বিজ্ঞাপনও ক্রেতাদের কাছে অভিনবত্ব তৈরি করেছে। একদিকে নব্বই-এর দশকের সেই বিখ্যাত বিজ্ঞাপনে আর পাঁচটা পেনসিলের সঙ্গে  প্রতিযোগিতার দৌড়ে নটরাজ পেনসিল অনায়াসে জিতে গিয়েছে। অন্যদিকে অপ্সরার 'একস্ট্রা ডার্ক' পেনসিল পরীক্ষার খাতায় একস্ট্রা মার্কস এনে দিয়েছে। সেই থেকে আজ অবধি দীর্ঘ ৬২ বছরের যাত্রাপথে 'নটরাজ' আর 'অপ্সরা' আমাদের শৈশবের নস্টালজিয়া হয়ে থেকে গিয়েছে।

                         অপ্সরা পেনসিল

১৫৬০ সালে ইতালিয়ান দম্পতির তৈরি কাঠের ফ্রেমবন্দি গ্রাফাইট দিয়েই পেনসিলের যাত্রাপথের সূচনা হয়েছিল। ভারতে প্রথম পেন্সিল তৈরি শুরু হয় ১৯৫৮ সালে। 'হিন্দুস্তান পেনসিলস্ প্রাইভেট লিমিটেড'-র হাত ধরে। 'নটরাজ' ব্র্যান্ডের নাম নিয়ে প্রথম পেনসিল তৈরি শুরু করে এই কোম্পানি। প্রথমদিকে পেনসিলের পাশাপাশি ইরেজার আর পেনসিল কাটার তৈরিও শুরু হয়। পরবর্তীকালে ১৯৭০ সালে 'অপ্সরা' নামক ব্র্যান্ড নিয়ে আসেন উদ্যোক্তারা। অপ্সরাই ভারতে প্রথম নন-ডাস্ট ইরেজার নিয়ে আসে। তারও বেশ কিছুদিন পর, ২০০৭ সালে এই হিন্দুস্তান কোম্পানি নটরাজ পেন্সিলের খোলসের জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখে,  একই আদলে তৈরি করে নটরাজ পেন।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,আমি নিজে এই নটরাজ পেনে মাধ্যমিক পরীক্ষা সাঙ্গ করি।

                         নটরাজ পেন
 
এছাড়াও অপ্সরা ব্র্যান্ডেই প্রথম আসে ড্রইং পেনসিলের ধারণা। বাজারে বিক্রি হতে থাকে সবুজ খোলসের '2B', '4B', '8B' পেন্সিল। আজও আঁকার পেনসিলের বিকল্প হিসেবে অপ্সরার আশপাশে কারোর জায়গা হয়নি।

মুম্বাই শহরে প্রথম যাত্রা শুরু হয় হিন্দুস্তান পেনসিলস্ প্রাইভেট লিমিটেডের। বর্তমানে দেশের ৫টি জায়গায় ১০টি কারখানা রয়েছে এই কোম্পানির। এছাড়া এদেশের চাহিদার পাশাপাশি আরও প্রায় ৫০টি দেশে এই হিন্দুস্তান পেনসিলের প্রোডাক্ট রপ্তানি করা হয়। এখনো প্রতিদিন প্রায় ৮ মিলিয়ন পেন্সিল, ১.৫ মিলিয়ন কাটার, ২.৫ মিলিয়ন ইরেজার, ০.২ মিলিয়ন স্কেল, ১ মিলিয়ন পেন তৈরি হয় এই কোম্পানিতে, এমনটাই জানা যায় বিভিন্ন সূত্র থেকে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক তাগিদকে ধরে রাখতে পেনসিল, পেন, ইরেজার, পেনসিল কাটারে পাশাপাশি রুলার, গাণিতিক যন্ত্রপাতি, মেকানিকাল পেনসিল, কালার পেনসিল কিংবা মোম রং বা জল রং প্রস্তুত শুরু করে এই কোম্পানি। শুধু তাই নয় সময়ের সঙ্গে এসেছে একাধিক রঙের এবং গঠনের পেনসিল, ইরেজার। এসেছে একাধিক রঙের খোলস। 

              অপ্সরা ও নটরাজের প্রোডাক্ট 

বর্তমানে শুধু পেনসিল নয়, একাধিক মাপের পেনসিলের সিসও আলাদা করে কিনতে পাওয়া যায়। গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর  যুগে দাঁড়িয়ে, কাঠের পেনসিল প্রস্তুতিতে গাছ কাটার বিকল্প হিসেবে এই কোম্পানি এক দৃষ্টান্তমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বন্যকাঠ ব্যবহারের কথা না ভেবে এই কোম্পানি নিজস্ব গাছ লাগিয়ে কাঠ কাটা এবং পাশাপাশি আবার নতুন গাছ লাগানো এই পদ্ধতিকেই অবলম্বন করে এসেছে। ফলে সহজেই রক্ষা করা গিয়েছে জীব বৈচিত্র্য। শুধু পেনসিল, পেন কিংবা যন্ত্রপাতি প্রস্তুতই নয়, পাশাপাশি একাধিক সামাজিক কাজেও যুক্ত থেকেছে হিন্দুস্তান পেনসিলস্ প্রাইভেট লিমিটেড। তৈরি করেছে নটরাজ এডুকেশনাল ট্রাস্ট। মেয়েদের স্কুল তৈরির পাশাপাশি সেরিব্রাল পলিসি, মানসিক ও শারীরিক ভাবে অক্ষম মানুষের ব্যবহারিক ও পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছে এই কোম্পানি
                   নটরাজ জ্যামিতি বক্স 

বর্তমানে এই পেপারলেস প্রযুক্তির যুগে যদি কারোর উপরে প্রবল আঘাত এসে থাকে, সে হল পেনসিল। একসময় লেখনীর সমস্ত দায়িত্বই একা হাতে সামলেছে পেনসিল, কিন্তু আজ আর তার তেমন কদর করে না কেউই। কেবল নতুন শিক্ষার্থীদের হাতে আর শিল্পীর ক্যানভাসে অথবা জীববিদ্যা বা ভূগোলের খাতায় স্কেচ করতে কিংবা বড়োজোর কাঠের কাজের সময় মাপ নিতে ডাক পড়ে তার।

যদিও কম্পিউটারের যুগে বাঙালির জীবনে পেন্সিল আজ কতটা তা নিয়ে ভাববার অবকাশ প্রায় নেই বললেই চলে। তবুও ছেলেবেলার স্কুলব্যাগটা ঘাঁটলে নিশ্চয়ই সেই স্মৃতি আজও খানিকটা উস্কানি দিয়ে যায়। তাই আজও নতুন বইয়ের পাতায় দাগ দিতে আনাচে কানাচে হাতড়ে আমরা এক টুকরো পেনসিল খুঁজি। ছেলেবেলার সেই স্মৃতিতে আর অভ্যাসে বদল ঘটেনি আমাদের। বদল ঘটেনি পরিচিত ব্র্যান্ডেও। দোকানে পেনসিল কিনতে গেলে তাই আজও আমরা কেবল নটরাজ কিংবা অপ্সরাই খোঁজ করি। পরিচিত রং আর চিরকালীন অভ্যাস চারটাকা দামে দিব্যি কিনে আনি।।

                         -----------------------

★★★উপরিউক্ত প্রবন্ধটি কোনো গবেষণাপত্র বা এরূপধর্মী কোনো কাজ নয়।কতকগুলি সংগৃহিত [বিভিন্ন বই,ইন্টারনেট,উইকিপিডিয়া,Article,বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম থেকে নেওয়া তথ্য] তথ্যের ছাত্রপাঠ্য এবং সুখপাঠ্য বিশ্লেষণ মাত্র।এরূপ ইতিহাসের আরও ছোটো বড়ো গল্প, প্রবন্ধ,আলোচনা পড়ার জন্য আমার ব্লগটি ফলো করুন সকলে। যথাযথভাবে আরও লেখার চেষ্টা করব।।

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভারতবর্ষে পর্তুগীজ আগমনের ইতিবৃত্তঃ- একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা।

প্রাচীনকাল থেকেই বৃহত্তর বঙ্গদেশ( বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম ) ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের এক অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। বাঙলার ক্ষেতের অফুরন্ত ফসল এবং তাঁতিদের হাতে বোনা কাপড়,ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধনসম্পদের লোভে যুগ যুগ ধরে দেশ-বিদেশের বণিকরা ছুটে এসেছে এই দেশে।ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ইউরোপীয় বণিকদের আনাগোনা শুরু হয় এই বাঙলায়। ইউরোপীয়দের মধ্যে সমুদ্রপথে পর্তুগিজরাই প্রথম বাঙলায়, তথা ভারতীয় উপমহাদেশে এসে পৌঁছায় ও বাংলাসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ করে। মুঘল সম্রাট আকবরের অনুমতিবলে হুগলীতে তারা পর্তুগিজ বন্দর-নগরী পত্তন করেছিল। সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে হুগলী ছিল বাঙলার অন্যতম প্রধান এক নগরী।তবে এখানে এসে তারা পরবর্তীসময়ে হার্মাদগিরি করার ফলে সম্রাট শাহজাহান সহ পরবর্তী সম্রাটদের বিরাগভাজনের কারন হন তারা।এসব বিভিন্ন কারণে সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে পর্তুগিজরা হুগলী ছেড়ে চলে যেতে শুরু করলে সেই স্থান দখল করে ইংরেজ ও ওলন্দাজরা । কিন্তু এখনো একটু খোঁজ করলেই হুগলীর পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায় – হয়ত কোন একটা এলাকার নাম, অথবা কোন একটা...

"জয়নগরের মোয়া-উপাখ্যান"

শীতকাল এলেই বাঙালীর যেটা সবার আগে মাথায় আসে তা হল নলিনগুড়,পিঠেপুলি,আর জয়নগরের মোয়া।এগুলো ছাড়া চলবেই না।আমরা সকলেই এইসব বিভিন্ন খাদ্যের সাথে পরিচিত।আজ এরকমই এক সুস্বাদু মিষ্টান্ন "জয়নগরের মোয়া" -র ইতিবৃত্ত তুলে ধরছি আমার ছোট্ট প্রবন্ধ-পটে।ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন। ইতিহাসের সাথে ভূগোলের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়।ভূগোল ছাড়া ইতিহাস সম্ভব নয়,সুতরাং ভৌগলিক দিক থেকে জয়নগর মজিলপুর হলো দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ছোট্ট একটা গ্রাম। প্রায় পাঁচশো বছর আগে আদি-গঙ্গা এইখান দিয়ে বয়ে বয়ে মিশে গিয়েছিলো বঙ্গোপসাগরে। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর শিষ্যদেরকে নিয়ে নীলাচলে যাবার সময় এখানে থেমে ছিলেন। সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় পরিপুষ্ট এই অঞ্চলটিকে অনেকেই পশ্চিম বাংলার 'দ্বিতীয় নবদ্বীপ' বলেও অভিহিত করে থাকেন। মোটামুটিভাবে ধরা হয়,১৯২৯ সাল নাগাদ এই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ দুই ব্যক্তি নৃত্যগোপাল সরকার (বুচকি বাবু) এবং পূর্ণচন্দ্র ঘোষ, দু'জনে মিলে সর্বপ্রথম 'মোয়া' নামক লোভনীয় মিষ্টান্নটির জন্ম দেন। তারপর সেই মোয়ার সুস্বাদ, সুঘ্রাণ আর গুণ ক্রমে ক্রমে সারা পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই, এ...

"কালাপাহাড়"- ইতিহাসে একজন ধ্বংসকারী হিসাবে পরিচিত

প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গল্পে একটি বিধ্বংসী মোষের নাম দিয়েছিলেন কালাপাহাড়। কে জানে কেন এমন নামকরণ! মোষ সে কালো, সে ভেঙেচুরে ফেলে—তাতে কালো হতে পারে। কিন্তু কালা তো বধির—যে কানে শুনতে পায় না। তাহলে যার কানে ভালো কথা প্রবেশ করে না—সে-ই ‘কালা’। কখনও কখনও পাহাড় কালো রঙের হয়, বিশাল চেহারার কাউকে আমরা পাহাড়ের সঙ্গে তুলনাও করে থাকি। বিরাট আকারের কালো রঙের মহিষ—কালাপাহাড়? কিন্তু এই কথাটা মনে এলেই মনে পড়ে এটা একজন বিরাট চেহারার দস্যু— যে ধর্ম মানে না— ধর্মস্থান গুঁড়িয়ে ফেলে লুঠতরাজ চালায় আর বড্ড গোঁয়ার গোবিন্দ। পাষাণের মতোই তার কঠিন মন— কারও কথায় কান দেয় না।একজায়গায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন এমন লোকের কথা ভেবেই—‘পিতামহের কীর্তির প্রতি কালাপাহাড়ি করা।’ তাহলে বোঝাই যাচ্ছে যে,লোকটা মোটেই সুবিধের ছিল না— সব কিছু ভেঙেচুরে নষ্ট করে ফেলাতেই যার প্রবল আনন্দ।তবে এর পিছনেও নির্দিষ্ট কারণ ছিল,ছিল হিন্দুধর্মের গোঁড়ামি,রক্ষণশীলতা,অস্পৃশ্যতা। তবে পরিচয়য়ের দিকে যাওয়া যাক এবার। কালাপাহাড় (১৫৩৪-১৫৮০ ) ছিলেন কররানী রাজবংশর এক দুর্ধর্ষ সেনাপতি। তার বাড়ি ছিল অধুনা বাংল...